৪ মাসের শরীর কেমন করে সইবে এই যন্ত্রণা
একটি শয্যায় চিকিৎসা চলছে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া তিন শিশুর। ছবিটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে তোলা সমকাল
শৈবাল আচার্য্য
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামেও তীব্র হয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। হামের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালে। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এই নিয়ে বিশেষ আয়োজন। প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার শৈবাল আচার্য্য
শিশু আনাফের বয়স মাত্র ৪ মাস। এই বয়সে তার স্থান হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেঝেতে পাতা শয্যায়। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার পুরো শরীর। সঙ্গে রয়েছে তীব্র শ্বাসকষ্ট। শরীরজুড়ে লালচে ফুসকুড়ি। তীব্র যন্ত্রণায় রোগ-শয্যায় কাটছে তার সময়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, জন্মের পর শিশুকে ৯ মাস বয়সে হাম, মাম্পস ও রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ ও ১৫ মাস বয়সে দিতে হয় দ্বিতীয় ডোজ। তবে শিশু আনাফ বয়স ৯ মাস পূরণ হওয়ার আরও ৫ মাস আগেই আক্রান্ত হয়েছে হামে।
শুধু আনাফ নয়; চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশ টিকা নেওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। এদের কারও বয়স ৪, কারও ৬ মাস। টিকা পাওয়ার আগেই হামের লক্ষণ নিয়ে আরিবা, সাবিহা, তাকরিম, আলীও ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। এই শিশুদের নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের মিজেলস ব্লকে এ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া অর্ধশত শিশুর সবারই হামের লক্ষণ দেখা গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শিশু। ৩ এপ্রিল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হিসাবে সন্দেহজনক ৮৭ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকার ৮২ জন ও বিভিন্ন উপজেলার ৫ জন রয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় ১২ জন শিশুর শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজনই কক্সবাজারের বাসিন্দা। হাম শনাক্ত করতে ১৫৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের তথ্য বলছে, শিশু বিভাগের ‘মিজেলস ব্লকের’ আওতায় এখন পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে। হামে আক্রান্ত সন্দেহে গত শুক্রবার একদিনেই ১৬ জন, বৃহস্পতিবার ১৭ জন ও বুধবার ১৮ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়।
এর আগের দিন একসাথে ভর্তি হয় রেকর্ড ২৬ জন। এর মধ্যে পাঁচজনকে পিআইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ, ম্যাক্স, সিএসসিআর, মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন, ন্যাশনাল, ডেল্টা, পলি, শেভরন, এপিকসহ প্রায় হাসপাতালে।
চমেক হাসপাতালের মিজেলস ব্লকে সরেজমিন দেখা যায় কোন শিশুর মুখে লাগানো হয়েছে অক্সিজেনের নল, কারও হাতে আবার স্যালাইনের লাইন। কোনো শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে কোলে নিয়ে নেবুলাইজ করছেন মা। এদেরই একজন ৫ মাস বয়সী ঝর্ণা চৌধুরী। পটিয়ার মোজাফফরা বাদ এলাকা থেকে এসেছে সে। গত রোববার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝর্ণার মা সুমি চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘পাঁচদিন ধরে বাচ্চার জ্বর। সাথে প্রচণ্ড কাশি, বুকে কফ জমে গেছে। যে কারণে বাচ্চা ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। জ্বর আসার পরদিন থেকে শরীরজুড়ে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এতে যন্ত্রণায় ছটফট করছে বাচ্চা। আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।’ বাবা বিশু চৌধুরী বলেন, ‘ওর বয়স মাত্র ৫ মাস, তাই এখনও হামের টিকা দেওয়া হয়নি। অথচ ৯ মাস পূরণ হওয়ার আগেই সে হামে আক্রান্ত হলো। বাচ্চাটার কষ্ট সহ্য হচ্ছে না।’
পাশের শয্যায় চিকিৎসাধীন ৯ মাসের আনাসকে অনবরত নেবুলাইজ করছেন মা কাজল রেখা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওর পুরো পেটজুড়ে র্যাশ। কফের কারণে বুকে একধরনের শব্দ হচ্ছে। হামের এক ডোজ টিকাও দেওয়া হয়নি তাকে।’ নোয়াখালীর আল আমীন বাজার এলাকা থেকে গত রোববার আনাসকে ভর্তি করে মো. শাহাদাত ও কাজল রেখা দম্পতি। অন্য শয্যায় হামের লক্ষণ নিয়ে শয্যায় ছটফট করতে দেখা গেছে ৫ মাসের সৃজনী, ৬ মাসের সাঈম, ২ মাসের মোরসালিন, ৯ মাসের পার্থ, ১০ মাসের সাফওয়ান, ৭ মাসের তাহমিনা, ৯ মাসের তাকরিন, ৬ মাসের আরিশাকে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ ও ১৫ মাসে হামের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু এবার ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। হাম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। যা জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ লাল হওয়া, শরীরে লালচে র্যাশের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।’ তিনি জানান, মার্চ মাসে হামে আক্রান্ত ১০ জন শিশু তার হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে, চারজন এখনো ভর্তি আছে। পাঁচজনের পিআইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়েছে।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রতিদিনই হামের লক্ষণ থাকা অনেক শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানো হচ্ছে। হামের প্রকোপের এই সময়ে শিশুদের নিয়ে মা-বাবাকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হামে আক্রান্ত ও লক্ষণ থাকা শিশুদের অসুস্থ হওয়ার আগের ও পরের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হচ্ছে। টিকা নেওয়ার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুর জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘ভিটামিন এ’ সাপ্লিমেন্ট দিতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, খাওয়ার স্যালাইন, ফলের রস ও পুষ্টিকর তরল খাবার দিতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা করে গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
- বিষয় :
- অসুখ
