মাস গেল স্বস্তিতে, সামনে কী
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত পাওয়া সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর অভিযানের এক মাস ৯ দিন পার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগর এখন অনেকটাই শান্ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযানের পর এলাকায় বইছে স্বস্তির বাতাস। তবে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ঘিরে শঙ্কা কাটেনি।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগর এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ মার্চ পরিচালিত অভিযানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি সদস্য অংশ নিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টার অভিযানে এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অভিযানের পর দুটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরতে শুরু করেছে। নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন, সড়কের পাশের দোকানগুলোয় ক্রেতাদের ভিড়, শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত। র্যাব-পুলিশের টহলও অব্যাহত রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।
আলিনগরের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপনের ফলে নজরদারি বেড়েছে। আগে সন্ত্রাসীরা সিসিটিভি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করত, সেগুলো বন্ধ হওয়ায় তাদের ক্ষমতা কমেছে। এখন মানুষ কিছুটা সাহস পাচ্ছে।’ একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। আমরা শান্তি চাই– শুধু এক মাস নয়, বছরের পর বছর যেন এই শান্তি থাকে।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পর এলাকা ছেড়ে পালানো সন্ত্রাসীরা আশপাশের পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াছিন আত্মগোপনে থাকলেও রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন প্রকাশ্যে রয়েছে বলে দাবি তাদের। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কড়া নজরদারির কারণে তাদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছিল, তা বন্ধ না হলে স্থায়ী শান্তি ফিরবে না। স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল আলী বলেন, ‘পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিক্রি করা হয়। কয়েক লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্লট বিক্রি হয়। এই বাণিজ্যই সন্ত্রাসীদের মূল শক্তি।’
এদিকে, বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। স্থানীয় বাসিন্দা নীপোশ জানান, একটি বৈধ সংযোগ থেকে একাধিক ঘরে লাইন দিয়ে বা অবৈধভাবে নতুন সংযোগ দিয়ে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘২০০৬ সালে রংপুর থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছি। ৩ লাখ টাকা দিয়ে প্লট কিনেছি; যা আসলে খাসজমি। এখন বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি ১৫-২০ টাকা দিতে হয়, যেখানে সরকারি বিল ৭-৮ টাকা। এছাড়া মাসে ৩০০-৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জও দিতে হয়। বৈধ মিটার দিলে এসব চাঁদাবাজি বন্ধ হবে।’
এদিকে এলাকায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লা আল মামুন বলেন, ‘সলিমপুর ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে সার্ভে চলছে। ইতোমধ্যে ২০৩ নম্বর দাগে ইউনিয়ন ভূমি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। এখান থেকে ভূমি সংক্রান্ত সেবা দেওয়া হবে।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ‘যে প্লটে ভূমি অফিস করা হয়েছে, সেটিও আগে ব্যক্তি মালিকানায় কেনা ও নির্মিত ভবন।’
ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ‘খেজুরতলা এলাকায় ১০ পরিবারকে উচ্ছেদের পরিকল্পনা থাকলেও তা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সেখানে ৩ একর জায়গায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। আলিনগরেও আরেকটি ক্যাম্প হবে।’
গত ৯ মার্চের অভিযানে ৩০ জনের বেশি ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও ইয়াছিন, রোকন উদ্দিন, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুরসহ কয়েকজন এখনও পলাতক। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল অংশ রোকনের নিয়ন্ত্রণে এবং আলিনগর ছিল ইয়াছিনের দখলে।
অভিযানের এক মাস পর এলাকাজুড়ে স্বস্তি ফিরলেও স্থায়ী শান্তির জন্য সন্ত্রাসীদের সম্পূর্ণ নির্মূল, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং ভূমি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
- বিষয় :
- সন্ত্রাসবাদ
