পাহাড় ধ্বংসে প্রভাবশালীরা
বিপুল দাশ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিরসরাইয়ে একের পর এক পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। চলছে মাটি ও বালু বিক্রির মহোৎসব। কোথাও পাহাড় কেটে ট্রাকে মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কোথাও পাহাড়ে গর্ত করে পাম্প মেশিনের মাধ্যমে পাহাড়ে ধস নামিয়ে অভিনব কায়দায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ট্রাক, বালু ও যন্ত্রপাতি জব্দ ও বিকল করলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলতে থাকলে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে এবং আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। এরই মধ্যে গত ১৬ মার্চ অলিনগর এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সময় ধসে পড়ে জামশেদ আলম নামে এক শ্রমিক নিহত হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি পাহাড় কাটা বেড়ে গেছে। একাধিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দিনদুপুরে পাহাড় কেটে মাটি ও বালু বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পূর্বে এসব কর্মকাণ্ডে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিন উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী ও মেহেদীনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিনদুপুরে পাহাড় কেটে শত শত ট্রাক মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। করেরহাট ইউনিয়নের অলিনগর, সাইবেখিল, ঘেড়ামারা, কয়লা, ঝিলতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও পাহাড় ধসিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। এতে স্থানীয় সড়কগুলোও ট্রাক চলাচলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী একটি চক্রের কারণে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারছেন না তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, পাহাড় কাটার সময় শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও জড়িতরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল এবং কিছু অসাধু ব্যক্তিকে মাসোহারা দিয়ে এসব অবৈধ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাহাড় কেটে সরকারি খাসজমি ও সংরক্ষিত বনভূমিতে বসতি স্থাপনও করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাটি ও বালু বিক্রির মাধ্যমে রাতারাতি ধনী হয়ে উঠছে একটি চক্র। এর ফলে এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সমস্যা কিছুটা কম বোঝা গেলেও বর্ষায় এসব সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন এর আগে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেন। তবে এরপরও কিছু এলাকায় অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ অবৈধভাবে এ কাজ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, কোথাও পাহাড় কাটার খবর পেলে দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত এক বছরে ২০টিরও বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং কয়েকটি স্থানে জরিমানা ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসন এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শুধু অভিযান নয়, স্থায়ী নজরদারি ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। অন্যথায় পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমিধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
- বিষয় :
- মাটি
