এক প্রকল্পে ঘুরবে ৯ খাতের চাকা
প্রবল জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে উপড়ে পড়েছে পারকি সৈকতের ঝাউবন সমকাল
আহমেদ কুতুব
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
একদিকে বালুক্ষয়ে ভাঙছে ঝাউবন, অন্যদিকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেড়ে উপকূলে আঁচড়ে পড়ে। তাতে উপড়ে পড়েছে ঝাউগাছ। চার বছর ধরে দেড় কিলোমিটার বালুকাময় সৈকতের ঝাউবন ধ্বংস হচ্ছে। অন্যদিকে, পারকি সৈকতে আসা-যাওয়ার একমাত্র সড়কটি পর্যন্ত গত বছরের বন্যায় লন্ডভন্ড হয়ে যায়। পারকি সমুদ্রসৈকতের হারাতে বসা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সৈকত ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশে একগুচ্ছ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাকৃতিক ঝাউবন ফিরে আনার পাশাপাশি সৈকত ঘিরে টেকসই সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ, পর্যটনবান্ধন সৈকত তৈরিসহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন তারা। এক প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত সংরক্ষণের মাধ্যমে সমুদ্র পার ঘিরে নয়টি সেক্টর বদলে দিতে কাজ করছে পাউবো। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন ও পর্যটন সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপকূলের মানুষের যাপিতজীবনে শঙ্কার পরিবর্তে সমৃদ্ধি ঘটবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পারকি উপকূলীয় সৈকত ঘিরে ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলেমিটার দৈর্ঘ্যরে সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে উপকূলকে সুরক্ষিত করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পারকি উপকূলের প্রায় তিন কিলোমিটার সাগর পাড়ের তীর সংরক্ষণ ও শক্তিশালীকরণ করা হবে। এর মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের প্রাকৃতিক তাণ্ডব থেকে রায়পুরের অর্ধলাখ উপকূলীয় মানুষ সুরক্ষিত হবে। চলতি বছরের ২০২৬ সালের জুলাই থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পটির গুরুত্ব নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি পর্যটন শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি উপকূলের শিল্পকারখানা সুরক্ষিত করতে প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরেন। আগামী ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
যদিও গত বছর বর্ষায় বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে পারকি সমুদ্র সৈকত ও তার আশপাশের ঝাউবন উপড়ে ফেলে দেয় পানির ঢেউ । কয়েকটি স্থানে ভেঙ্গে গেছে পুরনো উপকূলীয় বেড়িবাঁধও।
পাউবো চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক বলেন, গত বছর সামুদ্রিক দুর্যোগে পারকি সমুদ্র সৈকত লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সৈকতের ঝাউ গাছগুলো উপড়ে ফেলে দেয় পানির সর্বগ্রাসী ঢেউ। অনেক বছরের পুরনো বেড়িবাঁধ সমুদ্রের পানিকে লোকালয়ে ঢুকা ঠেকাতে পারেনি। তাই এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামুদ্রিক দুর্যোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের ব্যপ্তি বৃদ্ধি ও সুদৃঢ় করা হবে। এছাড়া পারকি সৈকত সারা দেশের পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটি পর্যটন স্পট। তাই পর্যটন শিল্পের বিকাশে স্থায়ী ও অধিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ গত উন্নয়নে বৈপ্লবিক ভুমিকা রাখবে। আনোয়ারার লোকালয়ে সাগরের লবন পানি প্রবেশ ঠেকিয়ে বার্ষিক কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাউবো’র ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পারকি বিচ সংরক্ষণ প্রকল্পটি শুধু সমুদ্র সৈকতের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে নয়; এ সমুদ্র সৈকত ঘিরে উপকূলীয় নয়টি সেক্টরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে যেসব সেক্টরে পরিবর্তন ঘটবে তার মধ্যে- আনোয়ারা সমুদ্র উপকূলে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার সক্ষমতা আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কারণ এখন পুরনো যে বেড়িবাঁধ রয়েছে তার থেকে আরো চার থেকে পাঁচ ফুট উচ্চ বেড়িবাঁধ ও ব্লক বাধ দিয়ে টেকসই সুপার ডাইক ব্লক বেড়িবাঁধ তৈরি করে উপকূলকে সুরক্ষিত করা হবে। এখন পুরো এলাকাই অরক্ষিত রয়েছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে গত বছরের সাগরের জলোচ্ছ্বাস ও বন্যায়। প্রকল্পের মধ্যে পারকি ও রায়পুর এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ়করণের একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে। উপকূলকেন্দ্রিক অবকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। উপকূলীয় বেড়িবাঁধের নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া পারকি সমুদ্র পাড়ের সমতলের কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধে ভল্ট তৈরি করে প্রতিরোধমূলক প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে। চারশ' হেক্টর কৃষি জমিতে নতুন করে সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। বর্ষায় ও বন্যায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সাগরে সাইক্লোনকালীন সময়ে আনোয়ারার সাপমারা খালে মাছ-ধরা ট্রলার ও মৎস্যজীবীদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রয়ম তৈরি করা হবে। যাতে সাগরে দূর্যোগের খবর পেলে সাগর ছেড়ে সাপমারা খালে ট্রলারে নিয়ে জেলেরা নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন। এ জন্য সাপমারা খাল খননেরও উদ্যোগ রয়েছে। পারকি উপকূলে সবুজ বেষ্টনীর ব্যাপ্তি বাড়িয়ে পর্যটন সুবিধা সৃষ্টি করে পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে এখানে।
পাউবো সূত্র জানায়, প্রকল্পে পারকি উপকূল থেকে কর্ণফুলীর মোহনা পর্যন্ত টেকসই আধুনিক ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও তীর সংরক্ষণ ছাড়া ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৫০ মিটার থেকে ১ দশমিক ৮০ মিটার পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো ১৪ (২-ভেন্ট) তৈরি করা, ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় পৌনে তিন কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার সাপমারা খাল খনন করে নাম্ভ্যতা সৃষ্টি, ১৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূমি অধিগ্রহণ ও অফিস ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ হেক্টর বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ও নদীতীরের মধ্যবর্তী উন্মুক্ত ভূমিতে সবুজ বনায়ন করে ঘন ঝাউবন সৃষ্টি করবে পাউবো।
পারকি সৈকত ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাবেক সদস্য ও বারশত ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুম শাহ বলেন, সাগরের ঢেউ ও প্রাকৃতিক তান্ডবে পারকি সৈকতের ঝাউবনের সুন্দর্য দিন দিন কমে যাচ্ছে। সৈকতকে রক্ষায় সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাধ। কারণ এ সমুদ্র সৈকত মিনি কক্সবাজার হিসেবে খ্যাত। একে ঘিরে পর্যটন কমপ্লেক্সও তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি বহু কটেজ-রিসোর্ট রয়েছে। পাউবোর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছি।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ডেপুটি ম্যানেজার (পরিকল্পনা) শিপ্রা দে বলেন, পারকি সৈকত নানা দিক থেকে বাংলাদেশের একটি অনন্যসুন্দর বিনোদন স্পট। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি প্রচুর পর্যটক আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু সেখানে রাতে থাকার সুব্যবস্থা না থাকায় পর্যটন করপোরেশন একটি পর্যটনবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ১৩ একর জায়গায় ১৪টি বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক কটেজ, একটি মানসম্মত বার, আধুনিক রেস্তেরাঁসহ পর্যটকবান্ধন স্থাপন তৈরি শেষ পর্যায়ে। এর মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে একটি আধুনিক বিনোদন সুবিধা-সুবিধা উপহার দিতে পারবো আমরা।
আনোয়ারা উপকূলকে রক্ষা করার জন্য পারকি এলাকায় বনবিভাগ ১৯৯৩-৯৪ এবং ২০০২ সালে প্রায় ৮০ হেক্টর জায়গায় ঝাউগাছ রোপণ করে। পরে গাছগুলো বড় হয়ে পারকি সৈকতে রুপান্তর ঘটে।
- বিষয় :
- প্রকল্প
