ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র যেন গোয়ালঘর
লেমশীখালীর তহলীপাড়া ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় একপাশে জুয়ার আসর, অন্য পাশে ধান মাড়াই ও গবাদিপশু পালন চলছে সমকাল
হিরু আলম, কুতুবদিয়া (কক্সবাজার) থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ কুতুবদিয়া। চারপাশে অথৈ সাগর, মাঝখানে মানুষের বসতি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এক শান্ত জনপদ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস, আতঙ্ক আর মৃত্যুর বিভীষিকাময় স্মৃতি। উপকূলের এই দ্বীপের মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছে প্রকৃতির সঙ্গে। বর্ষা এলেই আতঙ্ক, আকাশে কালো মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে মানুষের। কারণ এই দ্বীপের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হারিয়েছে আপনজন-জলোচ্ছ্বাসে, ঘূর্ণিঝড়ে কিংবা সাগরের ভাঙনে।
যোগাযোগে যত কষ্ট
পর্যটননগরী কক্সবাজার থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে যেতে হলে প্রথমে বাসে করে যেতে হয় মগনামা ঘাট। সেখান থেকে সি-ট্রাক, ডেনিস বোট কিংবা স্পিডবোটই একমাত্র ভরসা। নৌযান ছাড়া দ্বীপে যাওয়ার অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। যাতায়াতভেদে ভাড়া গুনতে হয় ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে ঘাটে পৌঁছেই চোখে পড়ে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা। জীর্ণশীর্ণ জেটিঘাট দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন যাত্রীরা। জেটির ওপর মাছবোঝাই ট্রাকের ভিড়, এক কোনায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে শত শত গ্যাস সিলিন্ডার। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন ১০০ থেকে দেড় শতাধিক গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার এভাবে খোলা জায়গায় পড়ে থাকে। সামান্য দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে বড়ঘোপ ঘাট থেকে মগনামা ঘাটে এসে ভিড়ে একটি ডেনিস বোট। ৪২ থেকে ৪৫ জন যাত্রীর কারও গায়েই ছিল না লাইফ জ্যাকেট। বোটের ইজারাদার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘লাইফ জ্যাকেট থাকলেও যাত্রীরা পরতে চান না। সচেতনতার অভাব রয়েছে।’
দুপুরে বড়ঘোপ ঘাট পৌঁছে দেখা যায় আরও করুণ চিত্র। জেটির রেলিং ভাঙা, মরিচা ধরা লোহার কাঠামো বেরিয়ে আছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই পথ ব্যবহার করছেন। ঘাটে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দ্বীপে জন্ম নেওয়াটাই যেন আমাদের আজন্ম পাপ। সামাজিক নিরাপত্তা নেই, নিরাপদ আশ্রয়ও নেই। প্রতি বর্ষায় সাগর একটু একটু করে দ্বীপটাকে গিলে খাচ্ছে।’
দুর্যোগ যেন দ্বীপের নিয়তি
কুতুবদিয়া উপজেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত ইতিহাস বলছে, ১৫৬৯ সালের জলোচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে ১৭৬২ সালের ভূমিকম্প, ১৭৯৫ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৮৭২ সালের মহাপ্রলয়, ১৮৯৭ সালের ‘মগীর তুফান’, ১৯০৫ সালের টর্নেডো, ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাস– বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে এই দ্বীপ। সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে আছে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ওই দুর্যোগে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগরে বিলীন হয়ে যায় দ্বীপের বিশাল অংশ। বিশেষ করে খুদিয়ার টেক নামের একটি পুরো ওয়ার্ড হারিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরের গর্ভে। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাদের কেউ না কেউ ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারাননি।’
এতসব বিপর্যয়ের পরও এখনও টেকসই বেড়িবাঁধ কিংবা স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সামান্য বৈরী আবহাওয়ার খবর এলেই মানুষ ছুটে যায় আশ্রয়কেন্দ্রে। অথচ সেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থাই এখন সবচেয়ে ভয়াবহ।
আশ্রয়কেন্দ্র নয়, যেন ধ্বংসস্তূপ
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৮৩ দশমিক ৩২ বর্গমাইল আয়তনের এই উপজেলায় রয়েছে ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রই জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী।
প্রিজম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে ভেতরের মরিচা ধরা রড বের হয়ে গেছে। ছাদের বিভিন্ন অংশে ফাটল, বেইজ পিলারের লোহা দৃশ্যমান। প্রায় ৪০টি জানালার একটিতেও নেই গ্রিল কিংবা দরজা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আশ্রয়কেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশ দখল করে বসবাস করছেন পাশের ইটভাটার শ্রমিকরা। বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী বসতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের ছয়-সাত মাস কেন্দ্রটি এভাবেই দখলে থাকে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মীর কাশেম বলেন, ‘সাবেক ইউএনও নুরে জামান আশ্রয়কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছিলেন। সংস্কারের জন্য ২০ লাখ টাকার অনুদানের কথাও হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর আর কোনো কাজ হয়নি। বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় এলে আমাদের সামনে হয় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া, নয়তো ভবনচাপায় মরার শঙ্কা।’
জুয়ার আসর, গোয়ালঘর আর মাদকের আখড়া
উত্তর মলমচর ব্র্যাক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। নিচতলার একপাশে চলছে জুয়ার আসর, অন্য পাশে ধানমাড়াই ও গবাদিপশু পালন। সিঁড়ির রেলিং নেই, জানালার লোহার অংশ খুলে নিয়ে গেছে চোররা। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন বাঁচানোর আশ্রয়কেন্দ্র। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মানিক বলেন, ‘একসময় এই কেন্দ্রটি ভোটকেন্দ্র ছিল। এখন এর অবস্থা এত খারাপ যে ভোটকেন্দ্রও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে সবাই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু পরে আর কেউ আসে না।”
অন্যদিকে, আলী আকবর ডেইল কুতুব আউলিয়া শামসুল উলুম আজিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা নামের তালিকাভুক্ত আশ্রয়কেন্দ্রটির অবস্থাও নাজুক। সেখানে শিশু থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করলেও ভবনের ছাদ থেকে নিয়মিত পলেস্তারা খসে পড়ছে। ব্যবহারযোগ্য নেই একটি টয়লেটও। শিক্ষার্থী রবিউল আলম জানায়, “কিছুদিন আগে এক সহপাঠীর মাথায় ছাদ থেকে ইট পড়ে মাথা ফেটে যায়। বর্ষাকালে জোয়ারের সময় মাদ্রাসায় আসতেও ভয় লাগে।”
মাদ্রাসার সুপার আবুল আনচার সোইয়াব বলেন, “জোয়ার এলে মাদ্রাসায় এক গলা পানি উঠে যায়। ভবনের ঝুঁকির কারণে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দপ্তরে অসংখ্য আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি।”
আশ্বাস আছে, সমাধান নেই
বর্ষা মৌসুমে মানুষের আতঙ্ক কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কুতুবদিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব উল আলম বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা সোহেল আহাম্মদ জানান, প্রতি সপ্তাহে সচেতনতামূলক মহড়া পরিচালনা করা হচ্ছে এবং দুর্যোগের সময় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
এদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান বলেন, “বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।”
- বিষয় :
- ঘূর্ণিঝড়
