ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সকাল-বিকেল হঠাৎ বাড়ে গাড়ি ভাড়া

সকাল-বিকেল হঠাৎ বাড়ে গাড়ি ভাড়া
×

 তৌফিকুল ইসলাম বাবর

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু থেকে বহদ্দারহাট হয়ে নিউমার্কেট। এটি নগরীর রুট তালিকার এক নম্বর সড়ক। ১০ কিলোমিটারের এই সড়কটির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের সর্বশেষ সরকার নির্ধারিত ভাড়া ২৫ টাকা। কিন্তু চলাচলকারী বাসগুলোয় আদায় করা হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। সড়কটির শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারের ভাড়া ১৩ টাকা হলেও বাসে নেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ টাকা। 

কালুরঘাট থেকে বহদ্দারহাট-আগ্রাবাদ হয়ে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটারের সড়কটি হচ্ছে তালিকায় ১০ নম্বর সড়ক। কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত বাস ভাড়া ৬৩ টাকা। বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ৮০ টাকা। সড়কটির কালুরঘাট থেকে আগ্রাবাদ বাদামতল মোড় পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটারের ভাড়া হচ্ছে ৩৩ টাকা। অথচ বাসে নেওয়া হচ্ছে অন্তত ৪০ টাকা। ভাড়া আদায়ের এই চিত্র থেকে দেখা যায়, নগরীতে চলাচলকারী বাসগুলোয় ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। তবে সকাল ও বিকেলের পিক আওয়ারে বাড়তি ভাড়া আদায়ের হার আরও বেড়ে যায়।
ঠাসাঠাসি করে যাত্রী পরিবহন, মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ ও যেখানে-সেখানে যাত্রী উঠানো-নামানো, যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে নগরীর গণপরিবহনে চলছে ‘নৈরাজ্য’। এর ওপর ‘বিষফোড়ায়’ পরিণত হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। আবার অসংখ্য গাড়ির ফিটসেন নেই। কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে এসব লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি।
ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়ায় মোড়ে মোড়ে জ্বলে না সড়কবাতি, হাতের ইশারায় চলে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ।

পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারার খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে– এমন মন্তব্য করে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া সমকালকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরমুখী মানুষের ঢল, মানসম্পন্ন যানবাহনের সংকট, সড়ক ও ফুটপাত বেদখল হয়ে যাওয়া এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়ন না করার ফলে যানচলাচল কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আবার যে রুটের পারমিট রয়েছে, অনেক গণপরিবহন সেই রুটের পরিবর্তে অন্য রুটে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। এতে নগরীর এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াতে দুর্বিষহ পরিস্থিতি শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে অপচয় হচ্ছে মূল্যবান শ্রমঘণ্টা।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে নগরীর যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ১০.৩ থেকে ১৩.৯ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করে। সামগ্রিকভাবে গাড়ির গতি ঘণ্টায় গড়ে ১১ কিলোমিটার। যেখানে একটি স্বাভাবিক ও সচল শহরের যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার হওয়ার কথা। এ থেকেই বোঝা যায়, পায়ে হাঁটা গতিতে নেমে আসছে গাড়ির গতি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সড়কে যখন একইসঙ্গে বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান ও সাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে, তখন সেই সড়ক থেকে কাঙ্ক্ষিত গতি থাকে না। এসব যানবাহনকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না গেলে সড়ক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কোনোটাই কমবে না।
নিউমার্কেট থেকে আগ্রাবাদ হয়ে এয়ারপোর্ট রুটটি তালিকার ৫ নম্বর সড়ক। এই সড়কের নিউমার্কেট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটারের তেলচালিত বাসের ভাড়া হচ্ছে ১০ টাকা। কিন্তু আদায় করা হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারদের বাগ্বিতন্ডা লেগেই থাকে।
আগ্রাবাদ থেকে লালখান বাজার হয়ে চকবাজার পর্যন্ত চলাচলকারী গ্যাসচালিত টেম্পোগুলোর ওঠা-নামায় নির্ধারিত ভাড়া ৫ টাকা। আগ্রাবাদ থেকে চকবাজারের ভাড়া ১২ টাকা। কিন্তু সকালে অফিস সময় ও বিকেলে ছুটির সময় হঠাৎ করেই বেড়ে যায় ভাড়া। 
গত মঙ্গলবার রাত ৮টায় আগ্রাবাদের বাদামতল মোড়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন। বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের মতো টেম্পোতেও হুড়োহুড়ি করে যাত্রী উঠছিলেন। কেউ কেউ টেম্পোর পেছনে বাঁদুরঝোলা হয়েও উঠে পড়েন। যাত্রীর এমন চাপ দেখে চালকরা বলতে শুরু করেন, ‘ওঠানামা ১০ টাকা’। আগ্রাবাদ-চকবাজার রুটে গ্যাসচালিত টেম্পো ও তেলচালিত চার চাকার মাহিন্দ্র ছাড়া বাস চলাচল করে না। ফলে সুযোগ বুঝে গ্যাসচালিত টেম্পোও ভাড়া আদায় করে তেলচালিত যানবাহনের মতো। অথচ তেল ও গ্যাসচালিত যানবাহনের ভাড়া সমান নয়।
আগ্রাবাদ-চকবাজার রুটে টেম্পোতে করে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত যাতায়াত করেন বেসরকারি ব্যাংক কর্মচারী আমির হোসেন। আগ্রাবাদ থেকে উঠে কাজীর দেউরী মোড়ে নেমে যান তিনি। এই দূরত্বের ভাড়া হচ্ছে ৮ টাকা। আমির হোসেন সমকালকে বলেন, ‘সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়তেই গাড়ি ভাড়া বেড়ে যায়। টেম্পোর ৮ টাকা ভাড়া হয়ে যায় ১০ থেকে ১৫ টাকা। এ ছাড়া ওঠানামা ভাড়া হয়ে যায় ১০ টাকা। কিন্তু এগুলো দেখার কেউ নেই। তাই যাত্রীদেরও কিছুই করার থাকে না।’

আরটিসিরি তথ্যমতে, নগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য যে ১১টি রুট রয়েছে, সেগুলোতে চলাচলের জন্য সিলিং করা রয়েছে এক হাজার ৩৪৮টি গাড়ি। এভাবে ১৬টি রুটের জন্য সিলিং করা রয়েছে এক হাজার ৩১৪টি হিউম্যান হলার। টেম্পোর জন্য নির্ধারিত রয়েছে ১৮টি রুট, সেখানে সিলিং করা রয়েছে দুই হাজার ৩৭২টি টেম্পো। সব মিলিয়ে নগরীর ৪৫টি রুটে পাঁচ হাজার ৩৪টি যানবাহন সিলিং করা রয়েছে। কিন্তু যানবাহনগুলোর একটি অংশ রুট পারমিট অনুযায়ী চলাচল করছে না। যেখান থেকে ছেড়ে যে গন্তব্যে যাওয়ার কিংবা যতদূর পর্যন্ত যায় না। ইচ্ছেমতো চলাচল করছে। এতে যাত্রীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। 
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ায় গত ২৩ এপ্রিল গাড়ির ভাড়াও বাড়ায় সরকার। আনুপাতিকহারে ভাড়া বাড়ানো হয় চট্টগ্রাম নগরীতেও। কিন্তু এর পরও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন গ্রুপের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল সমকালকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আমাদের দাবির মুখে সরকার গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। আমরা সেই হারে ভাড়া আদায়ে 
তালিকাসহ নির্দেশনা দিয়েছি। এরপরও কিছু কিছু অভিযোগ আসছে। তবে অভিযোগ পেলেই আমরা সংশ্লিষ্ট রুটের চালক-হেলপারদের সতর্ক করে দিচ্ছি।’

যে রুটের পারমিট সেই রুটে চলে না গাড়ি
নগরীর ১১টি রুটের মধ্যে ১০টি রুটেই নির্ধারিত স্থান থেকে বাস-মিনিবাসগুলো চলাচল করছে না। একইভাবে শর্ত অমান্য করে ইচ্ছেমতো স্টেশন বানিয়ে চলাচল করছে হিউম্যান হলার ও টেম্পোগুলো। হিউম্যান হলার চলাচলের জন্য নির্ধারিত ১৬টি রুটের মধ্যে মাত্র ছয়টি রুটে শর্ত মেনে নির্ধারিত স্থান থেকে চলাচল করলেও ১০টি রুটেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। টেম্পোর জন্য নির্ধারিত ১৮টি রুটর মধ্যে শর্ত মেনে চলাচল করছে মাত্র দুটি রুটে। একটি রুটে তো কোন টেম্পোই চলাচল করে না। অর্থাৎ ৪৫টি রুটের ৩৬টি রুটেই নির্ধারিত স্ট্যান্ড থেকে চলাচল করছে না গণপরিবহনগুলো!
যাত্রী কল্যাণ সমিতি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘কিছু সংখ্যক গণপরিবহন পারমিট থাকলেও নির্ধারিত রুটে চলাচল করে না। পরিবহনের মালিক-শ্রমিকেরা অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে তাদের সুবিধামতো স্থান থেকে গাড়ি ছাড়ছেন এবং ইচ্ছেমতো স্থানে গিয়ে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছেন। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পড়তে হচ্ছে।’ 

আরও পড়ুন

×