পরিত্যক্ত, ভাড়া ভবন ও ফাঁড়িতে ৬ থানার কাজ
আহমেদ কুতুব
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দূর থেকে দ্বিতল ভবনে বড় করে লেখা ‘চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন’। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই দেখা মেলে পুলিশের আনাগোনা। ভবনের নিচতলায় ডান পাশে রয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসির) কক্ষ। তার পাশে পরিদর্শকের (তদন্তের) কক্ষ। দুই কক্ষ পেরিয়ে সামনে যেতেই ডিউটি অফিসার ও অন্য পুলিশ সদস্যের বসার কক্ষ। ভেতরে ছোট্ট একটি হাজতখানা। পাশে ইউনিয়ন পরিষদের আরেকটি টিনশেট ভবন পুলিশ ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
২৫ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের ভাড়া ভবনে জোড়াতালি দিয়ে চলছে ‘কর্ণফুলী থানা’র কার্যক্রম। অবকাঠামো, স্যানিটেশন, বাসস্থানসহ নানা সমস্যার মধ্যে কর্ণফুলী থানার দেড় লাখ মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ২০০০ সালের ২৭ মে কর্ণফুলী থানা গঠিত হলেও এখনও ‘স্থায়ী’ ঠিকানা হয়নি।
শুধু কর্ণফুলী থানা নয়, ২৫ বছর ধরে ব্যক্তি মালিকানাধীন দ্বিতল আবাসিক ভবনে চলছে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা পুলিশের কার্যক্রম। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর মতো স্পর্শকাতর এলাকার নিরাপত্তার ভার এ থানার ওপর। অন্যদিকে, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি পণ্য তৈরির মতো আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম ইপিজেডের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘ইপিজেড থানা’। কিন্তু ১৩ বছর ধরে এ থানার কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া বাসায়। নেই কোনো অবকাঠামোগত সুবিধা। চট্টগ্রাম বন্দরের টিনশেট ভবন ভাড়া নিয়ে নাগরিক সেবা দিচ্ছে ইপিজেড থানা পুলিশ। একই হাল সমুদ্রসৈকত এলাকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘পতেঙ্গা থানা’র। ২৩ বছর কাঠগড়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভাড়া ভবনে থানার কার্যক্রম চলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা ভবন আগুনে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। তারপর থেকে সমুদ্রসৈকতের পাশে সেতু মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন একটি ভবনে অস্থায়ী ভিত্তিতে চলছে থানার কার্যক্রম।
নগরীর লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অর্ধেক থানারই নেই ‘স্থায়ী ঠিকানা’। ১৬ থানার মধ্যে আটটি থানার কোনোটি পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া বাসায়, কোনোটি সরকারি পরিত্যক্ত ভবনে, কোনোটি পুরোনো ফাঁড়িতে। নগরের ৮০ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থানা পুলিশের আবাসন সংকট চরমে। অবকাঠামোগত সমস্যা থাকায় ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে বসে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। নেই খাবারের সুব্যবস্থা। প্রকট স্যানিটেশন সংকট। একটা মাত্র টয়লেটই ভরসা থানা পুলিশ ও দর্শনার্থীদের।
এ ব্যাপারে সিএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘সিএমপির অনেকগুলো থানার স্থায়ী ভবন নেই। তবে বাকলিয়া, পতেঙ্গা, ইডিজেড, কর্ণফুলী ও চকবাজারের স্থায়ী ভবন তৈরির কার্যক্রম চলছে। নতুন ভবন হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ নগরের কর্ণফুলী থনার ওসি শাহীনূর আলম বলেন, ‘মাসে প্রায় সোয়া লাখ টাকা ইউনিয়ন পরিষদকে ভাড়া দিয়ে থানার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের নিচে থানার কার্যক্রম চললেও দ্বিতীয় তলায় চলে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। থানার নিজস্ব ভবন ও অবকাঠামো থাকলে ভাড়ার অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সেবা নিতে থানায় আসা নাগরিকদের নানা সমস্যায় পড়তে হতো না।’
ইপিজেড থানার ওসি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বন্দরের টিনশেট ভবনে কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছি। এখানে খুব গরম। স্থায়ী ভবন হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো যায়। তবে নতুন থানা ভবন হবে শুনছি।’
১৯৭৮ সালে ২০৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনকে ৬টি থানায় ভাগ করে সিএমপির যাত্রা শুরু হয়। ২০০০ সালে আরও ৬টি খুলশী, বায়েজিদ, পতেঙ্গা, বাকলিয়া, হালিশহর ও কর্ণফুলী থানা বাড়ানো হয়। ২০১৩ সালে বাড়ে আরও চারটি; আকবর শাহ, সদরঘাট, চকবাজার ও ইপিজেড থানা নিয়ে বর্তমানে সিএমপিতে ১৬টি থানা রয়েছে। থানার সংখ্যা বাড়লেও পুলিশ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েনি।
এদিকে, নগরীর আটটি থানার নেই স্থায়ী ভবন ও ভূমি। নগরের সিটি গেইট সংলগ্ন ‘আকবর শাহ থানার’ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে গণপূর্তের পরিত্যাক্ত ভবনে। ‘বায়েজিদ থানা’ পুরনো ফাঁড়িতে পরিচালিত হচ্ছে। অবকাঠামোগত সংকট প্রকট হওয়ায় থানার সামনের খালি জায়গায় টিনশেড ঘর তৈরি করে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হচ্ছে পুলিশ।
গত বুধবার সেবা নিতে আসা শেরশাহ হাউজিং এলাকার বাসিন্দা আবিদ হোসেন বলেন, ‘একটি জিডি করতে থানায় এসেছি। কিন্তু টয়লেট নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছি। থানায় নাগরিকদের জন্য পৃথক কোন টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। আর ‘চকবাজার থানা’র কার্যক্রম চলছে লাল চাঁদ রোডের পুরনো ফাঁড়ির স্থাপনায়। ‘সদরঘাট থানা’ও পুরনো ট্রাফিক ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সিএমপি’র কোতোয়ালী, ডবলমুরিং, খুলশী, পাঁচলাইশ, চাঁদগাঁও, হালিশহর, পাহাড়তলী ও বন্দর থানা নিজস্ব স্থায়ী ভবনে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
- বিষয় :
- পরিত্যক্ত ভবন
