ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার

জরুরি বিভাগে নেই সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, বন্ধ অস্ত্রোপচার

জরুরি বিভাগে নেই সার্বক্ষণিক  চিকিৎসক, বন্ধ অস্ত্রোপচার
×

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিচ্ছেন একজন ড্রেসার সমকাল

 মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

৩০ এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টায় পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মেডিকেল সেন্টারে যান যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহজাবিন আল মুন। সেখানে তখন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। আলট্রাসনোগ্রাম বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফারহানা ইয়াসমিন তার শারীরিক অবস্থা শুনে একটি ব্যথানাশক ইনজেকশন দেন। কিন্তু ব্যথা কমার বদলে আরও বেড়ে যায়, পা অবশ হতে শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টা শয্যায় শুয়ে থাকার পর বিষয়টি ওই চিকিৎসককে জানানো হয়। চিকিৎসক রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখতে আসেননি। পরে জরুরি বিভাগের মাধ্যমে রোগী ডা. কামরুনেচ্ছার কাছে যান। সেই চিকিৎসক ব্যথানাশক ও গ্যাস্ট্রিকের ইনজেকশন দিলে কিছুটা সুস্থবোধ করেন। 
মাহজাবিন বলেন, ‘আমি ২ ঘণ্টা এত কষ্ট পেলাম, অনুরোধ সত্ত্বেও চিকিৎসক ডা. ফারহানা ইয়াসমিন আমাকে দ্বিতীয়বার দেখতে আসা প্রয়োজন মনে করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে।’

জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকট, চিকিৎসকের অবহেলাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত চবি মেডিকেল সেন্টার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষের চিকিৎসার ভরসা এই সেন্টার। এখানে জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক কোনো চিকিৎসক থাকেন না। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফাঁকে ফাঁকে এসে চিকিৎসা দিয়ে যান। মূলত জরুরি বিভাগ সামলান ড্রেসাররা। 
হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কক্ষ থাকলেও সেটি বন্ধ, অব্যবহৃত পড়ে আছে সরঞ্জাম। আলট্রাসনোগ্রাম করা যায় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন। ইসিজি কক্ষও প্রায় তালা মারা থাকে। বাকি চার দিন ওই কক্ষ বন্ধ থাকে। করোনাকালে স্থাপিত সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম লিকেজের কারণে কিছু দিন ধরে বন্ধ। বন্ধ রয়েছে আইসোলেশন কক্ষটিও। অথচ সেখানে অনেকগুলো নতুন শয্যা, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার অব্যবহৃত পড়ে আছে। ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও একটি অচল, একটি শহর শাখায় ব্যবহৃত। ক্যাম্পাসে সচল তিনটির জন্য চালক আছেন ছয়জন। প্রত্যেককে ১২ ঘণ্টা করে ডিউটি করতে হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন ১৪ জন। কর্মকর্তা ৮ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ২৯ ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪ জন। শূন্য পদ মাত্র একটি।

মেডিকেল সেন্টার উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’
চাকসুর স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আফনান হাসান ইমরান বলেন, ‘জনবল সংকটের বিষয়ে শুধু চিঠি চালাচালিতে ফল আসবে না। প্রশাসনকে আরও সক্রিয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ আদায়ে সরব হতে হবে।’ 

জরুরি বিভাগ সামলান ড্রেসাররা
১২ মে সকাল দশটায় মেডিকেল সেন্টারে দেখা গেল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আদিল আলীর মাথা ফেটে গেছে, স্কুল বিরতিতে বন্ধুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে দেয়ালে আঘাত পেয়ে সে চিকিৎসার জন্য ছুটে এসেছে হাসপাতালে। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত ড্রেসার অপেক্ষারত অনেক রোগীর সামনেই খোলা জায়গায় ছেলেটির মাথার পেছনে সেলাই দিলেন। অথচ দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি মিনি অপারেশন থিয়েটার।

জরুরি বিভাগে মোট পাঁচজন ড্রেসার কর্মরত, একজন নারী ও চারজন পুরুষ। আট ঘণ্টা করে তিন শিফটের প্রতিটিতে থাকেন মাত্র একজন। ১২ মে কর্তব্যরত মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ‘এখন যদি এমন কোনো রোগী আসে যার সেলাই প্রয়োজন এবং আমি যদি তাকে নিয়ে উপরে মিনি অপারেশন থিয়েটারে যাই, তাহলে জরুরি বিভাগ ফাঁকা পড়ে থাকবে।’
জরির বিভাগের পাশের শয্যায় শুয়ে ছিলেন ফরেস্ট্রি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুরুজ্জামান নাদিফ। জ্বর নিয়ে মেডিকেল সেন্টারে এলে প্রথমে তাকে প্যারাসিটামলসহ কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। ছয় দিন খেয়েও সুস্থ না হওয়ায় আবার এলে অন্য একজন চিকিৎসক তাকে চিকিৎসা দেন। তবে তাতেও জ্বর না কমায় হাটহাজারীর একটি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। পরীক্ষায় জানা যায়, তাঁর টাইফয়েড হয়েছে। নুরুজ্জামান নাদিফ বলেন, ‘শুরুতে যথাযথ চিকিৎসা হলে এত ভুগতে হতো না। এখন ১২ ঘণ্টা পরপর ইনজেকশন নিতে হচ্ছে, সেজন্যই আজ এসেছি।’
দেলোয়ার হোসাইন আরও বলেন, ‘চবির এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য একটি মেডিকেল সেন্টার যথেষ্ট নয়। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হলে সবার সুচিকিৎসা নিশ্চিত হবে।’
মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. আইরিন পারভীন বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টারে মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশ রোগী এখানেই সুস্থ হয়ে যান। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০ জন রোগী আসেন, কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক রোগীকে বাইরে রেফার করতে হয়।’
জ্বর ও পেটব্যথার মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ এখান থেকেই দেওয়া হয় বলে জানান ডা. আইরিন। তিনি বলেন, ‘পেট ব্যথার রোগী আসার পর প্রথমে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হয়। একইসঙ্গে উপসর্গ দেখে গ্যাস্ট্রিক, অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা সংক্রমণ— কোনটি হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।’
চিফ মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন, ‘জরুরি বিভাগে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ডাক্তার থাকেন না। শিফট অনুযায়ী কর্মরত ১৪ জন ডাক্তার যারা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন তারা জরুরি বিভাগেও চিকিৎসা দেন।’

বন্ধ অস্ত্রোপচার কক্ষ ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম 
দ্বিতীয় তলায় উঠতেই চোখে পড়ে কাউন্সেলিং শাখা। তার পাশে মিনি অপারেশন থিয়েটার দরজা বন্ধ। কর্মরত দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত কক্ষ। কোনো রোগী থেকে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু লোকবল সংকটে অপারেশন থিয়েটার  পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।’
মিনি অপারেশন থিয়েটারের পাশের ১০২ নম্বর কক্ষ করোনাকালে আইসোলেশন কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ভেতরে ঢুকে দেখা যায় কক্ষটিতে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে ১০টি নতুন শয্যা, ১২টি পলিথিনে মোড়ানো স্ট্রেচার এবং ৮টি হুইলচেয়ার। বহুদিন ধরে অব্যবহৃত এসব সরঞ্জাম অকেজো হওয়ার পথে।
করোনাকালে স্থাপিত সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেমও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। পাইপ লিকেজের কারণে অচল এটি। দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ‘আইসোলেশন সেন্টার শুরুর দিকে পাঁচ মাস ব্যবহার করা হয়েছে। এখন হাসপাতালের রোগীদের সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সেবা দেওয়া হচ্ছে। করোনাকালে ছয়-সাত লাখ টাকায় স্থাপতি সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম চালু করতে দুই থেকে তিন কোটি টাকা লাগবে।’

প্যাথলজি ইউনিটে আধুনিক যন্ত্র
দ্বিতীয় তলায় প্যাথলজি ইউনিটে কর্মরত মোট নয়জন। তাদের মধ্যে একজন পরামর্শক, একজন চিকিৎসক, দুজন টেকনোলজিস্ট, একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার, দুজন ক্লিনার ও দুজন কম্পিউটার অপারেটর। তবে কম্পিউটার অপারেটর পদে যে দুজন কাজ করছেন, তাঁরা ইসিজি ইউনিটের টেকনোলজিস্ট।
ইসিজি ইউনিটের টেকনোলজিস্ট পুলক মিঞা বলেন, ‘ইসিজি ইউনিটে কেউ পরীক্ষা করতে এলে সেখানে সেবা দিয়ে আবার প্যাথলজিতে ফিরে আসি। লোকবল সংকটের কারণে দুই জায়গায় কাজ করতে হয়।’ এই বিভাগে কর্মকরত মুন্নি আক্তার আগে আলট্রাসনোগ্রাম ইউনিটের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
১৯৮৪ সালে চালু হওয়া এই ইউনিটে ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত মাত্র ১৬ ধরনের পরীক্ষা হতো। এখন ২০ ধরনের পরীক্ষা করা হয়। ২০১৯ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক যন্ত্রপাতি আনা হয়। বর্তমানে একটি সেমি অটোমেটিক ও দুটি অটোমেটিক যন্ত্র রয়েছে। 
প্যাথলজি বিভাগের চিকিৎসক জুলহাজ উদ্দিন মিঞা বলেন, ‘বিএ২০০’ যন্ত্রটির বয়স প্রায় ছয় বছর। একটি প্যারামিটারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় একটি পরীক্ষা স্থগিত আছে।।’
ইউনিটের প্রধান সিনিয়র অফিসার ড. সাইফুল মোস্তফা বলেন, ‘আগে জনবল ঘাটতি থাকলেও এখন তা অনেকটা কমেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
অবশ্য সরেজমিন তার কথার উল্টোচিত্র দেখা গেল। ১২ মে অর্থনীতি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল আমিন শরীফ ডায়াবেটিস পরীক্ষার ফলাফল দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাননি। তিনি বলেন, ‘এখানে স্বল্প খরচে পরীক্ষা হয়, কিন্তু ফলাফল পেতে অনেক সময় লাগে।’

আরও পড়ুন

×