ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আয়করের আওতায় আনার প্রস্তাবে পাহাড়ে ক্ষোভ

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আয়করের আওতায়  আনার প্রস্তাবে পাহাড়ে ক্ষোভ
×

 সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে আয়করের আওতায় আনার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘দীর্ঘদিনের কর অব্যাহতির সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে পার্বত্য অঞ্চলের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী আরও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।’
গত ১০ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত অর্থবিলে আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তপশিলের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে আয়করের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়। এরপর থেকেই পাহাড়ে এ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
পাহাড়ের বিভিন্ন মহলের দাবি, প্রস্তাবিত সংশোধনী বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে অঞ্চলটির আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাদের মতে, উন্নয়ন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়েই নীতিনির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আয়কর আইন ২০২৩ (সাবেক আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪) অনুযায়ী রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয় এতদিন করমুক্ত ছিল। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিমালা, ১৯০০ এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতেও অঞ্চলটির বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা জুমচাষ ও ক্ষুদ্র কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সমতলের মতো বিস্তৃত কৃষিজমি এখানে নেই। কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে এখানকার মানুষের আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম।’ তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য এলাকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এখনো বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক যোগাযোগ ও অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এসব বাস্তবতায় কর অব্যাহতির সুবিধা বহাল রাখা প্রয়োজন।’
রাঙামাটির ব্যবসায়ী রাখী চাকমা বলেন, ‘নতুন করে কর আরোপ করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। নতুন করের বোঝা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিমালা-
১৯০০ এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির আলোকে এ অঞ্চল বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে আসছে। তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে করের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’ প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবিতে প্রয়োজন হলে মানববন্ধন ও সমাবেশসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও জানান তিনি।
আইনজীবী দ্বীননাথ তংচংগ্যা বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এখনো জুমচাষনির্ভর। তাদের আয় খুবই সীমিত। এমন বাস্তবতায় এখনই তাদের আয়করের আওতায় আনা সমীচীন হবে না। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন সরকার পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ করমুক্ত সুবিধা বহাল রেখেছে। নতুন এই প্রস্তাব কার্যকর হলে সরকারের প্রতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীর আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।’
 

আরও পড়ুন

×