ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

চারা সংগ্রহের শখ থেকে সফল উদ্যোক্তা

চারা সংগ্রহের শখ থেকে  সফল উদ্যোক্তা
×

প্রথমবারের মতো কয়েকটি বিদেশি ফলের পরীক্ষামূলক আবাদও হয়েছে শরীফের বাগানে সমকাল

 বিপুল দাশ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শখের বশে দেশি-বিদেশি ফলের চারা সংগ্রহ দিয়ে যাত্রা শুরু। সেই শখই আজ তাকে পরিণত করেছে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে। মিরসরাই উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ওমর শরীফ এখন পাহাড়ে গড়ে তুলেছেন প্রায় ৫০ একরের একটি ব্যতিক্রমী ফলের বাগান। যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে দেশি-বিদেশি অর্ধশতাধিক জাতের ফল, মসলা ও ঔষধি গাছ। তার প্রতিষ্ঠিত ‘জোহরা অ্যাগ্রো ফার্মস অ্যান্ড নার্সারি’ দেখে স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তারা নতুন বাগান তৈরিতে মনোযোগী হয়েছেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রথমবারের মতো কয়েকটি বিদেশি ফলের পরীক্ষামূলক আবাদও হয়েছে এই বাগানে। এখানে রয়েছে অ্যাভোকাডো, থাই সফেদা, পিচ ফল, এলাচ, ডুরিয়ান, রাম্বুটান, লংগান, পুলসান, আবিওসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্লভ ফল ও মসলাজাতীয় গাছ। পাহাড়ি ভূমিতে বিদেশি ফলের সফল চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন তিনি।
সম্প্রতি উপজেলা কৃষি অফিস আয়োজিত মৌসুমি ফল মেলায় নিজের বাগানে উৎপাদিত প্রায় ৪০ প্রজাতির ফল প্রদর্শন করে পুরস্কার অর্জন করেছেন ওমর শরীফ। এক বাগানে এত বৈচিত্র্যময় ফল দেখে বিস্মিত দর্শনার্থীরাও।

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। কোথাও ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছের ডাল, কোথাও নতুন ফুলের সমারোহ। বছরের প্রায় প্রতিটি সময়ই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায় এই বাগানে।
জানা যায়, ২০০৩ সালে কয়েকটি ফলের চারা সংগ্রহ করে পাহাড়ে পরীক্ষামূলকভাবে বাগান শুরু করেন ওমর শরীফ। তখন দুর্গম ওই পাহাড়ে মানুষের যাতায়াতও ছিল খুবই সীমিত। সমতল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে প্রতিদিন বাগানে যেতে হতো। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ দুই দশকের নিরলস পরিশ্রমে তিনি গড়ে তুলেছেন আজকের এই বিশাল বাগান।
চারা সংগ্রহের জন্য তিনি শুধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নয়, বিদেশেও ছুটে গেছেন বহুবার। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন দুর্লভ ফল, ফুল ও ঔষধি গাছের চারা।
বর্তমানে তাঁর বাগানে রয়েছে কিউজাই, ব্যানানা, চাকাপাত, রামগই, বারি-৪, গৌড়মতি, আম্রপালি, কাটিমন, ব্রুনাই কিং, চিয়াংমাই, মরিয়ম, কোকোনাট, মিয়াজাকি, অম্বিকা ও জেসি জাতের আম। রয়েছে চায়নিজ কমলা, দার্জিলিং কমলা, বারমাসি মাল্টা, ভিয়েতনামি নারিকেল, থাই মিস্টি লেবু, ড্রাগন ফল, রাম্বুটান, লংগান, লটকন, অ্যাভোকাডো, থাই সফেদা, থাই আমলকি, পিচ ফল, তিন ফল, থাই জাম্বুরা, মাতুয়া, ডুরিয়ান, পুলসান, কাজুবাদাম, কাঁঠাল, লিচুসহ অর্ধশতাধিক ফলের গাছ। পাশাপাশি এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, আদাসহ নানা মসলাজাতীয় গাছও রয়েছে। তাঁর নার্সারিতে এসব গাছের চারাও বিক্রি করা হয়।
ওমর শরীফ বলেন, ‘শখ থেকেই শুরু করেছিলাম চারা সংগ্রহ। পরে এটি নেশায় পরিণত হয়। তবে শুধু চারা লাগালেই সফল হওয়া যায় না। প্রতিটি গাছের আলাদা পরিচর্যা ও চাষপদ্ধতি জানতে হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, পড়াশোনা করে এবং বাস্তবে প্রয়োগ করেই আজকের অবস্থানে এসেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের নতুন নতুন উদ্ভাবিত ফল ও ফুলের চারা সংগ্রহ করা আমার নেশা। এসব চারা থেকে নতুন গাছ তৈরি করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করছি। কৃষি বিভাগ ও মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারাও একাধিকবার আমার বাগান পরিদর্শন করেছেন।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘ওমর শরীফের বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক দুর্লভ ফলের গাছ রয়েছে। প্রায় দুই দশকের শ্রমে তিনি এই বাগান গড়ে তুলেছেন। তাঁর দেখাদেখি অনেক তরুণ এখন ফলের বাগান গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টিতে তাঁর উদ্যোগ অনুকরণীয়।’

আরও পড়ুন

×