বন্যপ্রাণীর জন্য গাছ লাগান তারা
স্বেচ্ছাশ্রমে গহিন পাহাড়ে গাছের চারা রোপণ করেছেন জুরাছড়ি উপজেলার বনযোগীছড়া ইউনিয়নের হাল্যারাম পাড়ার বাসিন্দারা সমকাল
সংবাদদাতা, জুরাছড়ি (রাঙামাটি)
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়জুড়ে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে একদল নারী-পুরুষ এগিয়ে চলেছেন। কারও হাতে গাছের চারা, কারও মাথায় বাঁশের ঝুড়ি, আবার কারও হাতে কোদাল ও দা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, তারা নিজেদের জমিতে বাগান করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের গন্তব্য ব্যক্তিগত জমি নয়; পাহাড়ের মৌজা বন। উদ্দেশ্যও নিজেদের লাভ নয়–বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকট দূর করা, গাছ লাগিয়ে বনকে সমৃদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলা।
রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার বনযোগীছড়া ইউনিয়নের হাল্যারাম পাড়ার বাসিন্দারা সম্প্রতি স্বেচ্ছাশ্রমে বনযোগীছড়া মৌজা বনে দেশীয় ফলদ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করেছেন। নারী, যুবক ও প্রবীণ মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের দলটির ব্যতিক্রমী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বন সংরক্ষণে দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
বন্যপ্রাণী উদ্ধার দলের সদস্য জেনি চাকমা বলেন, ‘বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ে বন উজাড় হওয়ার ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক খাদ্যের উৎস কমে যাচ্ছে। এতে বানর, পাখি, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন প্রাণী খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষ-প্রাণীর দ্বন্দ্ব বাড়ছে। সেই বাস্তবতা থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বনের ভেতরে– এমন সব দেশীয় ফলজ গাছ লাগানোর, যেগুলো বড় হলে বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস হবে।
এই কর্মসূচিতে জাম, গুটগুটি, জলপাই, হরীতকী, কাঁঠাল, লটকন, কাউফল, তেঁতুল, আমসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির চারা রোপণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কয়েক বছরের মধ্যেই এসব গাছ বনকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নন্দ চাকমা বলেন, ‘বনের প্রাণীরা যাতে খাবারের জন্য লোকালয়ে না আসে, সে জন্যই আমরা তাদের খাদ্য উপযোগী গাছ লাগাচ্ছি। বন বাঁচলে বন্যপ্রাণীও বাঁচবে।’
বনযোগীছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তোষ বিকাশ চাকমা বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া বন সংরক্ষণ সম্ভব নয়। হাল্যারাম পাড়ার মানুষের এই উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।’
মৌজা বনের সভাপতি ও স্থানীয় হেডম্যান করুণা ময় চাকমা বলেন, ‘এই বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের পরিবেশ, পানির উৎস, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ বন রেখে যেতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
বনযোগীছড়া মৌজা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সালমা আক্তার বলেন, ‘চারা রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থাও করা হবে। স্থানীয়দের নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গাছগুলো রক্ষা করা হবে।’ স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ে দেশীয় ফলজ গাছের সংখ্যা বাড়লে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়, মাটিক্ষয় কমে, পানির উৎস সংরক্ষিত থাকে এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায়। এতে বন ও মানুষের মধ্যে একটি টেকসই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা কামনাশীষ খীসা জানান, জুরাছড়ি, বরকল, রাঙামাটি সদর, বিলাইছড়িসহ জেলার ১০ উপজেলায় পাহাড়িদের সংরক্ষিত পাড়াবনে প্রায় ২৫ হাজার স্থানীয় প্রজাতির চারা রোপণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’র অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইআরআরডি-সিএইচটি এবং ইউএনডিপির সহযোগিতায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে এসব চারা সরবরাহ করা হয়েছে।
পাহাড়ের নীরব সবুজের মধ্যে হাল্যারাম পাড়ার মানুষের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো বড় প্রকল্প নয়; বরং মানুষের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণ।
- বিষয় :
- বন্যপ্রাণী