রহিমা-মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের উদ্যােগ
চরাঞ্চলে শিক্ষার সুবাতাস
শেখেরকিল্লায় নির্মিত নান্দনিক আস-সালাম জামে মসজিদ সমকাল
মিসু সাহানিক্কন, রামগতি (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রামগতি উপজেলার চর এলাকা শেখেরকিল্লায় নির্মিত হয়েছে আস-সালাম জামে মসজিদ ও ঈদগাহ সোসাইটি। মসজিদটিতে প্রচলিত অর্থে কোনো জানালা নেই। কিন্তু ব্যতিক্রমী নকশার এই মসজিদে দিনের বেলায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রয়োজন হয় না। চারদিক দিয়ে অবাধে প্রবেশ করা প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসে সারাক্ষণ উজ্জ্বল থাকে পুরো মসজিদ। বর্ষায় বৃষ্টির ছোঁয়া, শীতে কুয়াশার শীতলতা আর পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো মসজিদের ভেতরে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব পরিবেশ।
মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে আস-সালাম হাফেজিয়া মাদ্রাসা, বালিকা বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজ। সেখানে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। এতে করে শিক্ষাবঞ্চিত চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার আলো। চর এলাকার দরিদ্র মানুষের সন্তানরা পাচ্ছেন বহুমুখী শিক্ষা। বর্তমানে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি পার্ক, যা এলাকাটিকে ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচিতি দেবে।
রহিমা-মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন মা-বাবার নামে এই মসজদি ও তিনটি শিক্ষালয় তৈরি করেছেন। এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দ্বিতল মসজিদটিতে প্রচলিত অর্থে কোনো জানালা নেই। এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে চারদিক থেকেই বাধাহীনভাবে আলো-বাতাস প্রবেশ করে। মুসল্লিদের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য রয়েছে দুটি দৃষ্টিনন্দন দরজা।
মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিরা প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। খোলা নকশা হলেও সরাসরি রোদ কিংবা বৃষ্টির ভোগান্তি নেই। সামনের পুকুরের পানিতে মসজিদের প্রতিবিম্ব যেন এর সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মসজিদের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি জলাধার। এসব জলাধারে সংরক্ষিত শীতল পাথর গ্রীষ্মকালে মসজিদের ভেতরকে শীতল রাখতে সহায়তা করে।
দ্বিতল মসজিদের নিচতলায় রয়েছে মূল নামাজের স্থান, মেহরাব, প্রশস্ত গ্যালারি ও মাঝখানে খোলা পথ; যার দুই পাশে রয়েছে জলাধার ও আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা। দোতলায় নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মসজিদের ছাদ ও দেয়ালের নির্মাণশৈলীও ব্যতিক্রম। বাইরে থেকে পুরো স্থাপনাটি ইটের তৈরি মনে হলেও ভেতরে রয়েছে রড, সিমেন্ট ও ইটের সমন্বয়ে শক্তিশালী আরসিসি কাঠামো। প্রায় চার হাজার বর্গফুট আয়তনের এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৪০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২১ সালের শেষ দিকে এটি মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। রহিমা-মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের অর্থায়নে নির্মিত মসজিদটির নকশা প্রণয়ন করে একটি দেশীয় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিদেশি স্থপতিরাও যুক্ত ছিলেন। মসজিদটির তথ্যচিত্র বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার কনফারেন্সেও পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রহিমা-মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। মা-বাবার নামে গঠিত ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনহিতকর কাজ করে আসছেন। প্রচারবিমুখ এই ব্যক্তির মূল লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাইনউদ্দিন পাঠান বলেন, ‘অনেকের মুখে এই মসজিদের কথা শুনেছিলাম। প্রকৃতির সঙ্গে এমন সুন্দর সমন্বয়ের একটি মসজিদে নামাজ আদায় করে মন অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরে যায়।’
আস-সালাম জামে মসজিদের ইমাম ওমর ফারুক বলেন, ‘মাদ্রাসাটিতে আরবির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও উন্নতমানের। বর্তমানে মাদ্রাসাটিতে পুরুষ ১৭০ ও মহিলা ৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বালিকা বিদ্যালয়ে ২৪০ জন শিক্ষার্থী এবং কলেজে প্রায় ৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লি মলেক মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন এ মসজিদে গড়ে ১৫০ জন মুসল্লি হয়। প্রতি জুমার দিন হাজারের বেশি মুসল্লি হয়। প্রতিদিন বিকেলে ও বন্ধের দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকে।’
রহিমা মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন বলেন, ‘মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহকে খুশি করতেই মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
- বিষয় :
- উদ্যোগ