ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সুফিয়া কামালের স্বপ্নের আলোয় আজও পথচলা কচি-কাঁচার মেলার

সুফিয়া কামালের স্বপ্নের আলোয় আজও পথচলা কচি-কাঁচার মেলার
×

সুফিয়া কামালের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ১৭:৩২ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ১৭:৩৪

বাংলা সাহিত্য, সমাজসেবা, নারীজাগরণ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল নাম সুফিয়া কামাল। তাঁর জীবন ও কর্ম শুধু একটি প্রজন্মকে নয়, যুগের পর যুগ মানুষকে আলোকিত করে চলেছে। সেই প্রেরণার উৎসকে স্মরণ করে তাঁর ১১৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার উদ্যোগে আজ শনিবার সকালে কচি-কাঁচা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শ্রদ্ধা, স্মরণ এবং আদর্শচর্চার মধ্য দিয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে এক আবেগঘন মিলনমেলা।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৃত্যপরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী এবং কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার প্রবীণ সদস্য আমানুল হক। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার সভাপতি খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান এবং সংগঠনটির প্রাক্তন সভাপতি ড. রওশন আরা ফিরোজ। শিশুবক্তা হিসেবে বক্তব্য দেয় শেখ মাশিয়াত আয়েশা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মেলার ছোট্ট বোন তিলোত্তমা বিশ্বাস।

প্রধান আলোচক আমানুল হক বলেন, সুফিয়া কামাল শুধু একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু এবং সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অনন্য পথপ্রদর্শক। কচি-কাঁচার মেলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল একজন মায়ের মতোই স্নেহময় ও আন্তরিক। শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা, সংস্কৃতিবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও অনুকরণীয়।

সভাপতি খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে কচি-কাঁচার মেলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, কচি-কাঁচার মেলা কেবল একটি সংগঠন নয়; এটি শিশুদের সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সুফিয়া কামালের বাড়ির আঙিনায় যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ মহীরূহে পরিণত হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে শিশুদের বিকশিত করার যে স্বপ্ন সুফিয়া কামাল দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজকের প্রজন্মের।
ড. রওশন আরা ফিরোজ তাঁর বক্তব্যে সুফিয়া কামালকে সময় অতিক্রম করা এক আলোকবর্তিকা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নারীজাগরণ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কবির ভূমিকা বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবনসংগ্রাম ও আদর্শ পৌঁছে দেওয়া সময়ের দাবি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শিশুবক্তা শেখ মাশিয়াত আয়েশার বক্তব্যে উঠে আসে শিশুদের অনুভূতির সরল প্রকাশ। সে বলে, ছোটবেলা থেকেই তারা শুনে আসছে, সুফিয়া কামাল খালাম্মা ছোটদের খুব ভালোবাসতেন। কচি-কাঁচার মেলার জন্মও তাঁর বাড়ির আঙিনা থেকেই। তাই, তাঁকে মনে হলে একজন খুব আপন মানুষের কথাই মনে পড়ে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করে আয়েশা।

অনুষ্ঠানের সভাপতি তিলোত্তমা বিশ্বাস বলেন, শিশুদের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ, সহমর্মিতা এবং সংস্কৃতিচর্চার যে বীজ সুফিয়া কামাল বপন করেছিলেন, তা আজও কচি-কাঁচার মেলার প্রতিটি কার্যক্রমে জীবন্ত হয়ে আছে। তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করে চলেছে।

আলোচনা পর্বের পর অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেলার ভাই-বোনেরা কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে প্রিয় ‘খালাম্মা’কে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। পরিবেশিত হয় সুফিয়া কামালের রচনা অবলম্বনে গান ও কবিতা। শিশু-কিশোরদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার উজ্জ্বল প্রকাশ।

উল্লেখ্য, কচি-কাঁচার মেলার ইতিহাসের সঙ্গে সুফিয়া কামালের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি মাদুর পেতে শিশু-কিশোরদের মানবিক, সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল কচি-কাঁচার মেলা। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আর এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে রয়েছে কবির স্নেহ, প্রেরণা ও আদর্শের অমূল্য অবদান।

আরও পড়ুন

×