কমনওয়েলথ শিক্ষার্থীদের তরুণ প্রতিনিধি রিফাদ
শেখ রিফাদ মাহমুদ ছবি : সংগ্রহ
আশিক মুস্তাফা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৩
শেখ রিফাদ মাহমুদ। কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ভারত, ঘানা, নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। রাজধানীর প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথে ছুটে চলার গল্প শুনেছেন আশিক মুস্তাফা
শুরুতেই শেখ রিফাদ মাহমুদের কাছে জানতে চাই, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন। কবে থেকে এর সঙ্গে আপনি জড়িত এবং কোন কোন দেশ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, ‘আসলে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক। কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তিনটি। আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি ভাইস প্রেসিডেন্ট, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড পার্টিসিপেশন পদে। এ পদে আমার বিপরীতে ভারত, ঘানা, নাইজেরিয়া ও কেনিয়া থেকে পাঁচজন প্রার্থী ছিলেন। এশিয়া থেকে একমাত্র আমিই ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছি। ২০২৫ সালের ১ জুলাই দ্য কমনওয়েলথের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে মনোনয়ন আহ্বান করা হয়। সেখানে ১০টি পদের জন্য মোট ২০০-এর বেশি মনোনয়ন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১০টি পদের জন্য ৩৮ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। গত ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর অনলাইনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ১০টি পদের মধ্যে ৯টির জন্য ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে, এতগুলো যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে কমনওয়েলথের শিক্ষার্থীরা আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।’
নির্বাচিত ভিপি হিসেবে যা করবেন রিফাদ
কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্টের মেয়াদ তিন বছর। বর্তমান কমিটি ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত কাজ করবে।
মূলত আপনার কাজ কী হতে যাচ্ছে–এমন প্রশ্নের উত্তরে শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, ‘আমার আগে এই পদে উল্লেখযোগ্য অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ আমার পদটিতে ছিলেন নাইজেরিয়ান ছাত্র নেতা মুহাম্মদ অ্যাডেমি। মূলত আমার কাজ শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা। তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা এবং অংশগ্রহণ ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নীতি-অ্যাডভোকেসি, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখা। একই সঙ্গে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই নীতিমালা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করাও আমার কাজের মধ্যে পড়ে।’
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
শেখ রিফাদ মাহমুদের জন্ম নাটোরের সিংড়া উপজেলায় হলেও বেড়ে ওঠা কানাইখালীতে। বাবা স্থানীয় বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। মাও জড়িত শিক্ষকতা পেশায়। এ কারণে পরিবারের কাছ থেকেই পেয়েছেন পড়াশোনার প্রথম পাঠ। নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১৮ সালে নির্বাচিত স্কুল কেবিনেটের সভাপতি ছিলেন রিফাদ। এরপর কম্পিউটার টেকনোলজি বিষয়ে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে বর্তমানে পড়ছেন রাজধানীর প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছেন...
পড়াশোনার পাশাপাশি রিফাদ বর্তমানে কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি এডুকেশন রিলেশন অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘ যুব উপদেষ্টা গ্রুপ বাংলাদেশের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন; যেখানে তরুণদের মতামত ও সুপারিশ জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে তাঁর। এছাড়া লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘ নামে একটি জাতীয় সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রিফাদ। শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্ট ফান্ডের ইয়ুথ প্যানেল মেম্বার এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অধীনে বিশ্ব খাদ্য ফোরামের যুব অবজারভার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছি। আমার প্রতিষ্ঠিত এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি। যেমন–শিক্ষা সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, দরিদ্র শিশুদের পোশাক ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্ট প্রোগ্রাম। পাশাপাশি আমি ইনিশিয়েটিভ কনসালট্যান্সি নামে একটি স্টার্টআপও পরিচালনা করছি, যা উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় লাইসেন্সিং, আইনগত, টেকনিক্যাল এবং ডিজিটাল সাপোর্ট প্রদান করে।’
অর্জন এবং স্বাক্ষরিত শুভেচ্ছাবার্তা
নিজের অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, ‘২০২১ সালে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলাম, যদিও বিজয়ী হতে পারিনি। সেই বছরই নেপাল সরকার এবং গ্লোবাল ইয়ুথ পার্লামেন্টের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে নেপালের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট নন্দ বাহাদুরপুন আমাকে গ্লোবাল ইয়ুথ লিডার হিসেবে সম্মাননা প্রদান করেন। ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও খ্যাতনামা রচনা প্রতিযোগিতা ‘দ্য কুইন্স কমনওয়েলথ এসে কম্পিটিশন’-এর বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুব ক্ষমতায়ন তহবিল তথা গ্লোবাল ইয়ুথ মোবিলাইজেশনের ইয়ুথ প্যানেল মেম্বার হিসেবে আবেদন পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করেছি। সিএসএ ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বপ্রথম আমাকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরিত শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন। এটি আমার জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। দলের সর্বোচ্চ নেতারা আমার খোঁজ নিয়েছেন এবং আমাকে উচ্ছ্বসিতভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, যার জন্য আমি ও আমার পরিবার আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ!’
আগামীর স্বপ্ন
স্বপ্ন ও আগামীর পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, একটি ন্যাশনাল ইয়ুথ কাউন্সিল বা ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করা; যা দেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর ও প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে। এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান তরুণ প্রজন্মকে শুধু নীতি-প্রণয়ন,অ্যাডভোকেসি ও সুপারিশ প্রদানের সুযোগই দেবে না বরং তাদের দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কার্যকর অবদান রাখার সুযোগও নিশ্চিত করবে। এছাড়াও আমি চাই, শিক্ষার্থীরা যে কারিকুলামে পড়াশোনা করে, সেই কারিকুলাম প্রণয়নে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হোক। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু শিখবে না, বরং শিক্ষানীতি ও প্রোগ্রামের বিকাশে নিজস্ব প্রভাব রাখবে। আমি বিশ্বাস করি, তরুণদের অংশগ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সক্রিয় নেতৃত্বই আমাদের দেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সৃজনশীল ও প্রগতিশীল করে তুলবে। আমি বিশ্বাস করি, দেশের উন্নয়নে প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ, সমানাধিকারের বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য। তরুণরা যদি এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও শিক্ষিত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।’
- বিষয় :
- কমনওয়েলথ