ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তারুণ্য ২০২৫

তারুণ্য ২০২৫
×

আমিরুল ইসলাম , মুমতাহিনা করিম মীম, জুলহাস মোল্লা, তাসমিত আফিয়াত আর্নি

আশিক মুস্তাফা

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের এই উন্মাদ দুনিয়ায় যারা নতুন অতিথি, যারা তাল গাছের মতো মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছেন নিজেদের কাজ দিয়ে, প্রতিনিধিত্বশীল এই স্বপ্নবাজদের বছরটা কেমন গেল; বিভিন্ন মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা প্রতিনিধিত্বশীল এমন চার তরুণের কথা জানা যাক ছোট্ট করে। গ্রন্থনা করেছেন আশিক মুস্তাফা

আমিরুল ইসলাম 

ভারতে সদ্য শেষ হওয়া জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়ে ঝাঁকড়া চুলে আলো ছড়ান ২১ বছর বয়সী এ তরুণ। হকিতে বাংলাদেশের কেউ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলবেন তা ছিল হকিপ্রেমীদের ধারণার বাইরে। তরুণ কেউ বিশ্ব কাঁপাবেন স্বপ্নেও ভাবা যায়নি। জুনিয়র বিশ্বকাপ হলেও হকিতে বাংলাদেশের আমিরুল যা করেছেন তা পৃথিবীর অন্য কেউ অর্জন করতে পারেননি। আসলে তিনি যা করছেন তা স্বপ্ন নয়, বাস্তবেই রূপ দিয়েছেন। জুনিয়র হলেও হকির যে কোনো বিশ্বকাপে এটিই ছিল বাংলাদেশের অভিষেক। অভিষেক আসরে ১৭তম হলেও বিশ্বকাপে আমিরুলই ছিলেন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়। 
অভিষেক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ গ্রুপে তিন ও পজিশন লড়াইয়ে তিন ম্যাচ খেলে। মোট ছয় ম্যাচে তিন জয়, এক ড্র ও দুটিতে হেরে যায়। দলীয় পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। তবে সবকিছুতে ছাড়িয়ে গেছেন আমিরুল। ছয় ম্যাচে পাঁচটিতেই হ্যাটট্রিক; যা হকির যে কোনো বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত রেকর্ড। ছয় ম্যাচে ১৮ গোল, এটিও বিশ্ব রেকর্ড। 
অভিষেক বিশ্বকাপেই সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও হাতে উঠেছে তাঁর। বিশ্ব হকিতে যাদের নামগন্ধ নেই। সেই অচেনা-অজানা বালক আমিরুল এমন কীর্তি গড়েছেন। এক বিশ্বকাপ খেলেই আমিরুল এখন বিশ্ব হকির অন্যতম আলোচিত মুখ। 

 

মুমতাহিনা করিম মীম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেনড্রিক্স কলেজ থেকে পেয়েছেন ‘হ্যাস মেমোরিয়াল স্কলারশিপ’। এই ফুল-রাইড স্কলারশিপ প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শুধু চারজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়। সেই গৌরবময় তালিকায় স্থান করে নেওয়ার পাশাপাশি মীম ৩৬ কোটি টাকার স্কলারশিপ পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
মীম মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পেয়েছেন। সব মিলিয়ে তাঁর প্রাপ্ত স্কলারশিপের পরিমাণ প্রায় ৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে– হেনড্রিক্স কলেজ, ফ্র্যাংকলিন অ্যান্ড মার্শাল কলেজ, কলোরাডো ইউনিভার্সিটি বোল্ডার, পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি, নক্স কলেজ, স্পেলম্যান কলেজ, ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিসহ আরও অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠান। 
মীমের জন্য সবচেয়ে বিশেষ এবং গর্বের মুহূর্ত ছিল হেনড্রিক্স কলেজ থেকে ‘হেইস মেমোরিয়াল স্কলারশিপ’ অর্জন করা একটি প্রেস্টিজিয়াস ফুল-রাইড স্কলারশিপ, যা প্রতিবছর বিশ্বের হাজারো প্রতিযোগীর মধ্য থেকে চারজনকে দেওয়া হয়। মীম মনে করেন, এটি তাঁর মেধা, পরিশ্রম ও প্রতিভার অনন্য স্বীকৃতি। তিনি বিশ্বাস করেন, জীবনের পথচলায় ব্যর্থতা আসবেই–তাই বলে থামা চলবে না। তাঁর কাছে প্রতিটি ব্যর্থতা একেকটি শেখার ধাপ, সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। 
মীম মনে করেন, সত্যিকারের চেষ্টা আর নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকেই পৌঁছানো যায় সাফল্যের চূড়ায়! 

জুলহাস মোল্লা
গত ৪ মার্চ মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনার চরে হাজারো মানুষের সামনে নিজের হাতে তৈরি উড়োজাহাজ আকাশে উড়িয়ে তাক লাগিয়ে দেন এ তরুণ। 
পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি জুলহাস মোল্লা নিজের বানানো উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে উড়লেন। মানিকগঞ্জের জাফরগঞ্জ এলাকায় যমুনা নদীর চরে নিজের তৈরি উড়োজাহাজে উড়ে বেড়াচ্ছেন এই তরুণ। তা দেখতে নিচে ভিড় জমিয়েছেন জেলা প্রশাসকসহ জেলা-উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় হাজারো মানুষ। জাফরগঞ্জের এক গৃহবধূ রুখসানা বেগম। তিনি বলেন, ‘সামনে থেকে কখনও উড়োজাহাজ দেখিনি। এলাকার ছেলে উড়োজাহাজ তৈরি করেছে–তাই দেখতে এসেছি। এসে দেখলাম জুলহাসের উড়োজাহাজ আকাশে উড়ছে।’ 
জুলহাসের বাবা জলিল মোল্লা বলেন, “ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস কুড়িয়ে জমিয়ে রাখত। সুযোগ পেলে এসব নিয়ে খুটুর-খাটুর করত। বানাতো নানা জিনিস। পড়াশোনা বাদ দিয়ে এসব করার কারণ জানতে চাইলে বলত ‘দেখবে, কোনো একদিন এমন একটা জিনিস বানাব, যা দেখে সবাই চমকে উঠবে।’ আজ ছেলে সবার সঙ্গে আমাকেও চমকে দিয়েছে। আমার ছেলের বানানো উড়োজাহাজ আজ সত্যিই আকাশে উড়েছে। আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না!’’ উড়োজাহাজই এখন জুলহাসের ধ্যানজ্ঞান! জুলহাস বলেন, ‘আমি এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি এবং সাফল্যও পেয়েছি। তবে আমার আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দেশের আইন অনুযায়ী এ ধরনের উড়োজাহাজ তৈরি করা গেলেও ওড়ানোর বৈধতা নেই। সরকারি নীতিমালা মেনেই খোলা জায়গায় চর এলাকায় মাত্র ৫০ ফুট উচ্চতায় উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন করেছি। অনুমোদন পেলে এ উড়োজাহাজটি এক হাজার ফুট উচ্চতায় উড্ডয়ন করানো সম্ভব। আগামীতে আশা করি এসব বাধা কেটে যাবে এবং এই উড়োজাহাজকে ঘিরে স্বপ্ন দেখবে নতুন বাংলাদেশ।

 

তাসমিত আফিয়াত আর্নি

উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্লগ আনোকি মিডিয়া প্রভাবশালী চার মার্কিন-দক্ষিণ এশীয় ফ্যাশন ডিজাইনারের নাম গত ২২ মার্চ প্রকাশ করে। তাতে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে উঠে আসে তরুণ এই ফ্যাশন ডিজাইনারের নাম। গত ২৫ মার্চ এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে নতুন জার্সি পরে ভারতের বিপক্ষে লড়ে বাংলাদেশ ফুটবল দল। এর নকশাকারও আর্নি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ‘মিস ইউনিভার্স’-এ রিকশা, বর্ণমালা, মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশ, জামদানিসহ দেশীয় নানা উপাদানে পোশাকের নকশা করে প্রশংসায় ভাসছেন এই তরুণ ডিজাইনার। বাংলাদেশ ফুটবল দলের অফিসিয়াল নতুন জার্সিতে মুগ্ধ দেশ। এই জার্সির নকশা করেছেন তাসমিত আফিয়াত আর্নি। জার্সি সম্পর্কে জানতে চাইলে আর্নি বলেন, ‘লাল আর সবুজে বেশ কয়েকটি দেশের জার্সি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। পতাকার লাল সূর্য থেকেই প্রাণিত লাল রং। আবার আমাদের মানচিত্রে চোখ রাখলে নদীতে চোখ আটকে যায় মুহূর্তেই। বাংলাদেশের মানচিত্র দেখে সেই অনুযায়ী মোটিফেই আমি তুলে এনেছি জার্সির ক্যানভাসে। দুই হাতায় আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা থেকে মোটিফ খুঁজে এনেছি। শাপলার কলি আর পাপড়ি থেকে খুঁজে নিয়েছি ডায়মন্ড শেইপ নকশা। জ্যামিতিক মোটিফের প্রতি ছেলেদের জোর আগ্রহ আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ এটি এ দেশের ছেলেদের ফুটবল দলের জন্য তৈরি।’ আর্নি এখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বা বাফুফের অফিসিয়াল ডিজাইনার। তিনি নারী ও পুরুষের জাতীয় দলের জন্য জার্সি ডিজাইন করছেন। 

আরও পড়ুন

×