প্রেরণা
সমাজ বদলের আগে নিজেকে বদলাতে হবে
মারিতা চেং ছবি: সংগ্রহ
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মারিতা চেং। অস্ট্রেলিয়ান উদ্ভাবক এবং সমাজসেবী। রোবোগালস, এইপোলি ও রোবোটিক্স কোম্পানি আউবোটের প্রতিষ্ঠাতা। প্রেরণাদায়ী ও আলোচিত এই মানুষটির বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
যখন ছোট ছিলাম, মা আমাকে বাসার কাজ করতে বলতেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যখন কাজগুলো করতাম, তখন ভাবতাম কবে সে দিন আসবে, যখন একটি রোবট আমার সব কাজ করে দেবে! তখন চারপাশে খুঁজে সে রকম কোনো রোবটই দেখতে পেতাম না। তারপর দিবাস্বপ্ন দেখতাম, এ রকম একটি রোবট নিজে বানিয়ে দুনিয়ার সামনে রাখব। রোবোটিকস পড়তে যে ম্যাথ ও সায়েন্স প্রয়োজন হয়–এ ব্যাপারটাও আমার ভালো লেগেছিল। কেননা আপনি যদি নিয়ম মেনে কাজ করেন, তাহলে প্রতিবার একই আউটপুট আসবে; আর আপনি সেই নিয়ম-কানুনগুলো দিয়ে কিছু একটা তৈরি করে পৃথিবীর সামনে রাখতে পারবেন। কয়েক বছর পর আমি ইউনিভার্সিটিতে ঢুকি। ব্যাচেলর অব ইঞ্জিনিয়ারিং (মেকাট্রনিকস) বা ব্যাচেলর অব কম্পিউটার সায়েন্স ছিল আমার প্রিয় সাবজেক্ট। কেননা এমন একটি কোর্স আমি চেয়েছিলাম, যেটি আমাকে রোবোটিসিস্ট হতে সহায়তা করবে। শুরুতে এতই রোমাঞ্চিত ছিলাম যে, কোর্সের অন্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেখা করার তর সইছিল না। তবে প্রথম সেমিস্টারে ধাক্কা খেলাম ৫০ জনের ক্লাসে মেয়ে মাত্র পাঁচজন দেখে!
তারপর আরও জানতে পারলাম, অস্ট্রেলিয়ায় মোট ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে মেয়ে সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশ। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগল না। আমাদের চারপাশের বস্তু, যেমন–স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, ইলেকট্রিসিটি গ্রিড, ওয়াটার সিস্টেম, বসবাসের বিল্ডিং, ট্রেন, রোড–এসবের নির্মাণকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই পুরুষ–ভাবতেই কেমন যেন লাগে! আপনার কেমন লাগবে যে জিনিসটি প্রস্তুত করছেন ৫০%-৫০% নারী-পুরুষের সমাজের জন্য, সেটির ডিজাইন বোর্ডে থাকে যদি মাত্র ১০% নারী?
ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষে, ২০০৮ সালে, আমি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের হেড, প্রফেসর জেমি ইভান্সের কাছে গেলাম জানতে, তার ডিপার্টমেন্ট আমাকে এবং আমার বন্ধুদের কিছু ফান্ডিং দেবে কিনা রোবট বানানোর জন্য। তিনি জানালেন, একদল ইঞ্জিনিয়ার ছাত্রকে খুঁজছে, যারা ১২ বছর বয়সী শিশুদের রোবোটিকস পড়াবে। মনে হলো, এতে অংশ নিয়ে এ মাধ্যমে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোতে ভূমিকা রাখা সম্ভব। তার কাছ থেকে ফেরার পথে ভাবলাম, আমরা যদি একটি স্কুলের মেয়েদের পড়াতে পারি, তাহলে সব স্কুলের মেয়েদের পড়াতে পারব না কেন?
আর তাই একটি প্ল্যান বানানো শুরু করলাম, যেন এটা বাস্তবায়িত হতে পারে। বন্ধুদেরও নিযুক্ত করলাম এবং আমরা রোবোটিকসের ওপর অনুশীলন তৈরি করলাম। সেগুলো স্কুলগুলোতে পাঠালাম এবং আরও অনেক ভলান্টিয়ার নিযুক্ত করলাম। এভাবেই জন্ম ‘রোবোগার্লস’-এর। রোবোগার্লসের লক্ষ্য হচ্ছে, মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা এবং সেটিকে তাদের ক্যারিয়ারে রূপ দিতে সাহায্য করা। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের জন্য রোবোটিকস ওয়ার্কশপ তৈরি করা আর তাদের বোঝানো–ইঞ্জিনিয়ারিং কী এবং কেমন করে ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী জানে না, ইঞ্জিনিয়ারিং কী! তাই আমরা তাদের শব্দকোষে এটি অন্তর্ভুক্ত করালাম। আমরা তাদের বললাম, ইঞ্জিনিয়ারিং হলো, বিজ্ঞানের বাস্তব রূপ; যেটি পৃথিবীকে আরও সুন্দর বানাতে সাহায্য করে। আমরা মজার কিছু অ্যাক্টিভিটিসও রেখেছিলাম তাদের জন্য, যেন তারা ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আগ্রহ বোধ করে। স্কুলগুলোয় ওয়ার্কশপ করা ছাড়াও আমরা পাঁচ বছর বয়সী শিশু থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরী পর্যন্ত সবাইকে যুক্ত করি। এভাবেই সমাজ বদলাতে শুরু করি। তবে তার আগে নিজেকে বদলে নিয়েছিলাম!
- বিষয় :
- প্রেরণার কথা
