ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রেরণা

মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের বড় অর্জন

মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের বড় অর্জন
×

ফেরদৌস আলম

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাদিও মানে। আফ্রিকার দেশ সেনেগালের জাতীয় দলের ফুটবলার। সৌদি আরবের আল নাসর এফসির হয়ে পেশাদার ফুটবল দাপিয়ে বেড়ানো আলোচিত এই ফুটবলারের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনছেন ফেরদৌস আলম

বাম্বালি। পশ্চিম আফ্রিকার প্রত্যন্ত এক গ্রাম। কাদা-পানির পথ, হাসপাতাল তো দূরের কথা, বিদ্যুৎ কিংবা ইন্টারনেটও এখানে বিলাসিতা। মাত্র ২ হাজার মানুষের এই দরিদ্র জনপদে জন্ম আমার। অতিদারিদ্র্য, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে বেড়ে ওঠা আমার। বাবা ছিলেন ধর্মীয় নেতা, যিনি ভীষণ অসুস্থ অবস্থায়ও হাসপাতালে না যেতে পেরে প্রাণ হারান। কারণ, গ্রামের আশপাশে ছিল না কোনো হাসপাতাল। এই শোক, এই বাস্তবতা আমাকে বদলে দিয়েছে। দিয়েছে জীবনের নতুন পাঠ। 

ফুটবল মাঠের বিস্ময় ও আমার
দরিদ্র জীবন
কষ্ট আর দুর্দশার মধ্যে থেকেও অদম্য মনোবল নিয়ে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরি। খালি পায়ে খেলেছি মাঠে। কারণ জুতা কেনার সামর্থ্য ছিল না আমার। এটি কেবল আমার একার না; সমাজের অনেকেই এই কষ্ট করেছেন। স্বপ্নের সঙ্গে আপস করিনি আমি। ধাপে ধাপে উঠে এসেছি ইউরোপিয়ান ফুটবলের শীর্ষমঞ্চে। লিভারপুলে ছয় বছরের ক্যারিয়ারও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ–সবই জিতেছি আমি বা আমার দল। এরপর বায়ার্ন মিউনিখ এবং বর্তমানে সৌদি ক্লাব আল-নাসরে যোগ দিয়ে খেলছি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে। অথচ আমি একদম স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত।
 কারণ, আমার বারবার মনে পড়ে গ্রামের সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা। 

গ্রামের মানুষের জন্য 
আমার কাছে খ্যাতি-সম্পদ মানে মানুষকে সাহায্য করার হাতিয়ার। নিজের জন্মস্থান বাম্বালিতে গড়ে তুলেছি আধুনিক হাসপাতাল, যেখানে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা মেলে। তৈরি করেছি একটি স্কুল, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়া হয়–এ যেন এক ‘ডিজিটাল গ্রাম’ গঠনের প্রতিশ্রুতি!
শুধু তাই নয়, খেলার মাঠ, ডাকঘর, গ্যাস স্টেশন, ফোরজি ইন্টারনেট–সবই গড়ে তুলেছি নিজের অর্থায়নে। স্থানীয় শিশুদের জন্য নিয়মিত দিয়ে আসছি ক্রীড়াসামগ্রী। প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ৭০ ইউরো করে দিই, যা ওই এলাকার জীবনযাত্রার মানে বিশাল পরিবর্তন এনেছে।

গভীর অনুরাগ...
আমি নিজ হাতে মসজিদ পরিষ্কার করি। এ নিয়ে অনেকেই নানান কথা বলেন। আসলে এটি আমার ধর্মীয় অনুরাগ। আমি নিজ হাতেই লিভারপুলের স্থানীয় মসজিদের বাথরুম, অজুখানা পরিষ্কার করেছি। এখন যেই ক্লাবে আছি সেখানেও করি। ছোটবেলা থেকেই ধর্মের প্রতি আমার গভীর এই অনুরাগ। পরিবার থেকেই এই মহান শিক্ষা আমি পেয়েছি।
 
মানুষ মানুষের জন্য
আমার স্বাভাবিক জীবন নিয়ে অনেকেই নানান কথা বলেন। আসলে আমার বুঝে আসে না; আমি কেন ১০টি ফেরারি, ২০টি হীরার ঘড়ি, দুটি বিমান চাইব? আমি একসময় ক্ষুধার্ত ছিলাম, খালি পায়ে ফুটবল খেলতাম। আজ যা কিছু অর্জন করেছি, তা দিয়ে আমি আমার মানুষদের সাহায্য করতে চাই। আমি বিলাসবহুল জীবন চাই না। জীবন আমাকে যা দিয়েছে, আমার গ্রামবাসী যেন তার ভাগ পায়–এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই লক্ষ্যেই আমি জীবন পরিচালনা করছি।

জীবনের সার্থকতা
এই যুগে যেখানে অনেক তারকা নিজেদের সম্পদ, ফ্যাশন আর বিলাসিতাকে জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, সেখানে আমি দেখি,  সফলতা মানেই শুধু নিজের জন্য নয়, বরং তা দিয়ে অন্যদের জীবন বদলে দেওয়া। আমি হৃদয় দিয়ে বোঝাতে চাই–একজন মানুষ তখনই মহান হতে পারেন, যদি তিনি নিজের অতীত ভুলে না যান এবং সমাজের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার থেকে সরে না আসেন।
আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষ বড় হতে পারেন মাঠের খেলা দিয়ে, আর মহান হতে পারেন কেবলই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে!
আমি বড় হতে আসিনি পৃথিবীতে। 

আরও পড়ুন

×