ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঈদের ছুটি ও আমাদের গরুকাণ্ড!

ঈদের ছুটি ও আমাদের গরুকাণ্ড!
×

গরুর হাটে না গেলে এই ঈদ যেন জমেই না তরুণদের কাছে... জেমেনি এআই ন্যানো ব্যানানা

আশিক মুস্তাফা 

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলেই এলো কোরবানির ঈদ। এই ঈদে তরুণদের ভাবনা-চিন্তার সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে রাখে গরু। অনলাইনে গরু কেনা কিংবা বড়দের সঙ্গে গরু কিনতে হাটে যাওয়া, হাট থেকে গরুসহ উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘরে ফেরাসহ ঈদকে তরুণদের উদযাপনের অনন্য উপাদানে পরিণত করতে সাজানো হলো আজকের আয়োজন। লিখেছেন আশিক মুস্তাফা 

চলেই এলো ঈদ।। চারদিকে ঈদের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। ঈদের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে আপনারও নিশ্চয়ই নানা পরিল্পিনা রয়েছে? দেখুন তো আপনাদের ঈদ পরিকল্পনার সঙ্গে এই পরিকল্পনা মেলে কিনা?

শুরু হয়ে গেছে প্রস্তুতি  
তাসনুভা বের হয়েছেন ঈদের শপিংয়ে। সঙ্গে আছেন ওর তিন বন্ধু, সাফায়াত, সানি আর শর্মিষ্ঠা। শর্মিষ্ঠা এই ক’দিন পূজা নিয়ে বেশ ব্যস্ত  ছিলেন। আজ থেকে একটু ফ্রি। পূজার শপিংয়ে ওরা শর্মিষ্ঠাকে সাহায্য করেছিলেন আর ঈদের শপিংয়ে শর্মিষ্ঠা সাহায্য করছেন ওদের। এবারের ঈদের শপিংটা ওদের কাছে একটু স্পেশাল। কারণ এই প্রথম ওরা নিজেদের টুকিটাকি ফ্রিল্যান্স কাজের আয় দিয়ে পরিবারের সবার জন্য উপহার কিনবেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ক্লাসে তৃতীয় বর্ষে পড়েন ওরা। গত তিন বছর এমনটাই হয়ে আসছে। যে কোনো উৎসব কিংবা উপলক্ষে একসঙ্গে থাকেন। সব আনন্দ একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। একে অন্যের পরিবারের সঙ্গেও ওরা পরিচিত। ঈদটা নিয়ে তাই ওদের প্রস্তুতি-পরিকল্পনার শেষ নেই! 

শেষ সময়ে কেনাকাটা
‘দোস্ত কই তুই? আমরা সেই কখন থেকে বসুন্ধরার সামনে দাঁড়িয়ে আছি?’ তাসনুভা ফোনে চিৎকার করে বললেন সাফায়াতকে। ওদিক থেকে সাফায়াত বললেন, ‘এই তো দোস্ত, আর পাঁচ মিনিট, রাস্তায় যেই জ্যাম!’ তাসনুভা রেগেমেগে ফোন কেটে দিলেন! সাফায়াতের পাঁচ মিনিট মানে যে কমপক্ষে ২০ মিনিট, এটা ওরা ভালো করেই জানেন। অবশ্য আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। মাত্র পূজা শেষ হলো। আর কয়েকদিন বাদেই কোরবানির ঈদ। রাস্তায় যানবাহন আর মানুষের ভিড়ে ঈদের আমেজ সুস্পষ্ট। সেক্ষেত্রে আসলেই সাফায়াতের জ্যামের কথাটা ফেলে দেওয়া যায় না। অবশেষে সাফায়াত এলেন। ওদের শেষ সময়ের শপিংয়ের সময় এটি। ‘সবকিছুই পছন্দ হচ্ছে, আবার কিছুই পছন্দ হচ্ছে না’–এমন অবস্থায় পড়ে যান ওরা। বুঝে উঠতে পারেন না কোনটা কিনবেন আর কোনটা নয়। তাসনুভা মাঝে মাঝে রেগে যান, ‘যদি সাজেশনই না দিতে পারিস, আসছিস কেন শপিংয়ে?’ এটা শুনে আবার ক্ষেপে যান সাফায়াত, ‘তুইও তো বলতে পারলি না আমি নীল শার্ট নেব, নাকি সবুজ ফতুয়াটা!’ এই নিয়ে তুমুল তর্ক লেগে যায় দুজনের মধ্যে। তখন আবার শর্মিষ্ঠা আর সাফায়া ওদের মনে করিয়ে দেন সানি, ওরা শপিংয়ে এসেছেন, ঝগড়া করতে নয়! সব মিলিয়ে দারুণ কাটে ওদের সময়টা। সঙ্গে একটু ছবি তোলা, ঢাকার এখানে-সেখানে হওয়া নতুন নতুন ফুড কোর্টে খাওয়া–এগুলো তো হয়ই ঈদ শপিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে। 

গরুর হাটের অন্য মজা
সেই ছোটবেলায়, ক্লাস থ্রিতে পড়ে বোধহয় তখন রাফসান। তখন থেকেই ও বাবার সঙ্গে ওদের পাড়ার গরুর হাটে যান। সঙ্গে থাকেন ওদের বাড়ির কেয়ারটেকার আর দারোয়ান হক চাচা আর কিরন চাচা। গরুর হাটে ওর যে কত স্মৃতি রয়েছে, ইয়ত্তা নেই! গোবরে পা পিছলে পড়ে যাওয়া, গরুর শিংয়ের গুঁতো খাওয়া কিংবা কমপক্ষে একশ’বার রাস্তার মানুষের কাছে গরুর দাম বলতে বলতে হাট থেকে বাড়ি পর্যন্ত ফেরা–সব অভিজ্ঞতাই ওর রয়েছে। এখন সাফায়াতের বয়স সতেরো, এবারও ও বাবার সঙ্গে হাটে যাবেন। এবার অবশ্য ওর মূল আকর্ষণ নানা রঙের গরুর সঙ্গে ‘সেলফি’ তুলে ফেসবুকে আপলোড করা!
ভিন্ন পরিকল্পনা

ৎরাফিনার প্ল্যানটা অবশ্য ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট চুকিয়ে সবেই চাকরিতে ঢুকেছেন। এ বছর প্রথমবারের মতো ও আর ওর বড় ভাই মিলে কোরবানি দিচ্ছেন। দারুণ এক্সাইটেড, বাসায় জানাননি এখনও, ভেবেছেন মা-বাবাকে সারপ্রাইজ দেবেন। ঝামেলা অন্য জায়গায়। ওরা দুই ভাইবোনই অফিস নিয়ে বেশ ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা চলবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। গরু কেনার সময়টাই হয়ে উঠছে না ভাইবোনের কারোরই। রাফিনার কলিগ রিচি বুদ্ধি দিলেন ওকে। ‘গতবার আমিও এই ঝামেলাতে পড়েছিলাম। সমাধান কে দিয়েছে জানো? অনলাইন গরুর হাট!’ 
রাফিনরা তো আকাশ থেকে পড়লেন। তিথি বুঝিয়ে বললেন, এখন প্রায় সব অনলাইন শপিং ওয়েবসাইটে কোরবানির ঈদে গরু কেনার অপশনটা থাকে। ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুকলেই নানা আকারের, রঙের, দামের গরু-ছাগল বিক্রির অ্যাডভার্টাইজমেন্ট থাকে। রাফিনা তখনই দুয়েকটা ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখলেন, তিথি একটুও বাড়িয়ে বলছেন না। বেশ কয়েকটাতে আবার হোম ডেলিভারির সিস্টেমও রয়েছে। 
আবার একটি সাইটে তো দেখলেন বিনামূল্যে বিজ্ঞাপন দিলে উপহার হিসেবে গরু কিংবা খাসি উপহার পাওয়ার অফার! ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিজ্ঞাপন দেওয়ার এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তিনি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন, এভাবেই গরু কিনবেন এবার। ওর ভাইও আপত্তি করবেন না নিশ্চয়! তবে একটু দেখেশুনে বুঝে কিনতে হবে।

ভাবনা ওদের জন্য
তানিশা আর রিয়া ওদের কয়েকজনের বন্ধুসহ ঈদের এক মাস আগে থেকেই ব্যস্ত থাকেন। তবে এই ব্যস্ততা শপিং কিংবা ঘোরাঘুরি নিয়ে নয়। ওরা প্রতি ঈদে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পোশাক উপহার দেন। এক মাস আগে থেকে ওরা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আর্থিক সাহায্য চান। কাজটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়। টাকার হিসাব রাখা, কতজন শিশুকে পোশাক দেবেন, কোন বয়সী শিশু কতজন, ক’টা পোশাক কিনবেন–সবকিছু হিসাব করে এরপর টাকাগুলো দিয়ে ১ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নতুন পোশাক কেনেন। ঠিক ঈদের আগের দিন পোশাকগুলো ওরা বিলিয়ে দেন শহরের বিভিন্ন বস্তি, পার্ক কিংবা রাস্তায় থাকা পথশিশুদের মাঝে। ‘পোশাকগুলো হাতে পাওয়ার পর ওদের হাসিমুখগুলো দেখলে মনে হয় পৃথিবীতে এর থেকে সুখের আর কিছুই হতে পারে না! এ এক অমূল্য পাওয়া আমাদের কাছে, এটাই আমাদের ঈদ আনন্দ!’–বলছিলেন তানিশা।  

চল না ঘুরে আসি
‘ঈদের ছুটিটা কিন্তু কাজে লাগাতে হবে এবার। আগেরবার তো বান্দরবান ট্যুরটা মিস হলো, এবার চল যাই।’ সাফিন আর অহনের ঈদের ছুটির প্ল্যান চলছে। মাঝখানে সুমাইয়া বলে উঠলেন, ‘আমাকে তো বাসা থেকে যেতে দেবে না। তোরা ঘুরে আয়। তোরা ফিরলে আমরা সবাই একসঙ্গে আফতাবনগরে কাশফুল দেখতে যাব।’ সবাই এক কথায় রাজি।

আহা আনন্দ 
ঈদ আনন্দ সবার জন্য। বন্ধুদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ তো ভাগাভাগি করে নেবেনই। কিন্তু বাড়িতে যেই মানুষটা সব কাজে সাহায্য করেন তাকে ভুলে গেলে চলবে না। সবাই মিলে দারুণ একটি ঈদ কাটান–এই কামনা রইল সবার প্রতি। ঈদ মোবারক! 

আরও পড়ুন

×