ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রেরণা

প্রতিষ্ঠান নয়, পরিবারই চিন্তার বিকাশের জায়গা

প্রতিষ্ঠান নয়, পরিবারই চিন্তার বিকাশের জায়গা
×

জন ন্যাশ ছবি : সংগ্রহ

আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জন ন্যাশ। নোবেলজয়ী আমেরিকান গণিতবিদ। তাঁর জীবন নিয়ে সিলভিয়া নেসারের লেখা ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ গ্রন্থ অবলম্বনে, একই নামে ২০০১ সালে নির্মিত সিনেমা জিতে নেয় অস্কার। ১৯৯৪ সালে ‘ইকোনমিক সায়েন্স’-এ নোবেলজয়ী এই কিংদিন্তি গণিতবিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন আব্দুর রাজ্জাক

শৈশব থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরনের আচ্ছন্নতা রয়ে গেছে আমার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতেই অন্য ছাত্রদের তুলনায় আমি বরং একটু বেশি মাত্রায়ই অঙ্ক করতে পছন্দ করতাম। মিউজিকের প্রতি মোৎসার্টের যেমন টান ছিল, আমিও তেমনই টান বোধ করি অঙ্কের  প্রতি। খুব অল্প বয়সেই আমার বাবা-মা বুঝে গিয়েছিলেন তাদের ছেলেটার চিন্তা-চেতনায় বিশেষ কিছু রয়েছে। সেটির বিকাশ ঘটাতে প্রেরণা জুগিয়ে গেছেন তারা। স্কুলের যে শৃঙ্খলা, তাতে কোনো ছাত্রের বিশেষ কোনো মেধার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ বলতে গেলে ছিলই না। আপনি বিশেষ রকমের কিছু করে বসুন–এমন কোনো প্রেরণাও স্কুল থেকে পাইনি আমি। তবু অজান্তেই নিজের ভেতরে অঙ্ক ও বিজ্ঞানের প্রতি আচ্ছন্নতাকে ধরে রেখেছি।

নিখুঁত সমাধান
শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন অনেক জটিল বিষয়-আশয় ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমি মনে করি, আপনাকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বড় শহর কিংবা ছোট এলাকা– অবস্থানভেদে সমস্যা নানাবিধ হয়। একজন ছাত্রের উচিত তেমন দক্ষতা অর্জন করা, যা দিয়ে সে যে কোনো সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারে। এ কাজটা তারা অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সেই করে ফেলতে পারে–তা সেই সমাধান সর্বক্ষেত্রে নিখুঁত না হলেও সমস্যা নেই।
 
সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান 
সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বিদ্যমান। ফলে এ ব্যাপারে কিছু করা উচিত–এমনটা বলা খুব সহজ। কথা হলো, সমাজে ধনী ও গরিবের ব্যবধান বরাবরই ছিল। তবে একজন মানুষ ততটা গরিব না হলেও তাকে আমরা ‘গরিব’ বলে অভিহিত করতে পারি। আমি বলতে চাচ্ছি, যার কাছে প্রয়োজনের তুলনায় কম সম্পদ আছে, সেই গরিব। তার মানে, আপনার কাছে হয়তো কোনো জিনিস প্রয়োজনের তুলনায় শতকরা ১০ ভাগ কম আছে, আবার কোনো জিনিস ১০ ভাগ বেশি। তবে তুলনামূলকভাবে ব্যাপারটি হয়তো তত খারাপ নয়। 

প্রযুক্তির তুলনায় মানুষের ইতিহাস দীর্ঘ
আমি যখন ভারতে প্রথম গেলাম, তখন থেকে এই চিন্তাটি মাথায় ঘুরছে। সেটি ২০০৩ সালের জানুয়ারির ঘটনা। গ্রামাঞ্চলে গিয়ে দেখলাম বেশির ভাগ মানুষের উপার্জন একদমই কম। তা দেখে এই ভাবনা এলো, একই পরিমাণ উপার্জনকারী মানুষের জীবন-ব্যবস্থা অবস্থানভেদে একেক রকম। তাতে তাদের মধ্যে তেমন অনুতাপ নেই। তারা কিন্তু রাস্তার ভিক্ষুক নয়; বরং দেশটিরই উপার্জনক্ষম জনগণ। তারা তাদের প্রতিবেশীদের তুলনায় তেমন গরিব নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি বুঝতে পারবেন মানুষকে নানা পরিস্থিতির ভেতর জীবন কাটিয়ে নিতে হয়। মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ কিন্তু একেবারেই আদিম জীবন-যাপন করত। সেই তুলনায় আধুনিক জীবন-যাপন তো শুরু হয়েছে বলতে গেলে অতি সম্প্রতিই। আধুনিকতা নামের এই প্রযুক্তির তুলনায় পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। 
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য
‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ সিনেমাটি নিয়ে মন্তব্য করা সহজ। সিনেমাটি বানানোর অনুমতি দিয়ে আমার পরিবার অবশ্যই কিছু টাকা পেয়েছে। একটি মানসিক অসুস্থতার ধরন কী রকম হয় কিংবা কীভাবে সামলাতে হয় সেটি এই সিনেমার একটি অংশ। মানসিক অসুস্থতা, বা স্পষ্ট করে বললে সিজোফ্রেনিয়া ইতিহাসে একটি প্রতিকূলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এ কথা আপনি বলতেই পারেন। ফলে এটি থেকে সেরে উঠে কোনো মানুষ একেবারেই সুস্থ জীবন-যাপন করতে পারবে–বোধ করি এমনটা কেউ প্রত্যাশাও করে না। এ ধরনের রোগীকে সাধারণত মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর একজন ভোক্তা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। তাদের সবসময়ই ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়। তারা হয়তো হাসপাতালে ভর্তি থাকে না ঠিকই, কিন্তু তাদের পুরো পৃথিবীটাই হয়ে ওঠে একটা হাসপাতাল। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কোনো স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে না। তবে আমার ক্ষেত্রে এ রোগ থেকে একটা বড় ধরনের নিষ্কৃতি আমি পেয়েছি। বেশির ভাগ সময়ই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে সক্ষম হয়েছি। ফলে আমারটা ছিল একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা। এখন আর আমি মানসিক রোগী নই; আমাকে আর ওষুধ খেতে হয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার একমাত্র সন্তানটিকে ওষুধ খেতে হয় এবং নিয়মিত দ্বারস্থ হতে হয় মনোচিকিৎসকের। 

জীবনের অবিকল প্রতিচ্ছবি 
ফিল্মটি দেখিয়েছি কীভাবে এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যায় একজন মানুষ। সিনেমার লোকটি এখনও ওষুধ খায় এবং প্রচলিত ওষুধ গ্রহণে অস্বীকার করার পর থেকে সে এক ধরনের আধুনিক ওষুধের দ্বারস্থ এখন। তবে অসুখটির সঙ্গে তার লড়াই শেষ হয়নি এখনও এমন ইঙ্গিতই রয়েছে ফিল্মটির শেষে। ফলে আমার জীবনের সঙ্গে এই সিনেমাটির পার্থক্য এখানেই। এমন অসুখে পড়া একজন মানুষ নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন করছে–এমনটা দেখাতে চাননি ফিল্মটির নির্মাতা। পাছে তার ভয়, এ দেখে যদি এমন রোগীরা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়! ফলে ফিল্মটি আমার জীবনের অবিকল প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা যাবে না। কেননা, ১৯৭০ সালের পর থেকে এ রোগের একটা ওষুধও খাইনি।

জীবনে নোবেলের প্রভাব
নোবেল জেতাটা আমি মনে করি অন্য সব বিজয়ীর চেয়ে আমার জীবনে একটু বেশি মাত্রায়ই অসাধারণ প্রভাব ফেলেছিল; কেননা, ব্যক্তিজীবনে আমি তখন সাংঘাতিক বেসামাল অবস্থা পার করছিলাম। সে সময় আমি ছিলাম বেকার। শরীর-স্বাস্থ্য যদিও ভালোই ছিল, কিন্তু বয়স হয়ে গিয়েছিল ৬৬ বছর। ফলে বছরের পর বছর ধরে বেকার থাকার ফলে আমার সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন তখন হুমকির মুখে। এমন বৈরী সময়ে আমার পুরোনো কাজের জন্য বড় মাপের পুরস্কার পেয়ে যাওয়ায় সেটির বেশ প্রভাব পড়েছিল নিজেকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে। যদিও এর আগেই আমার বেশ নাম-ডাক হয়ে গেলেও বলার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সুপরিচিতি ছিল না। অর্থনীতি ও গণিতের সাহিত্য নিয়ে প্রচুর কথা বলেছি আমি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি পাওয়ার বিষয়টি ছিল 
একদমই আলাদা। এই পুরষ্কারটি 
আমাকে তা এনে দেয়। 

আরও পড়ুন

×