ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

প্রিয় দলের জন্য শত্রু শত্রু খেলা

প্রিয় দলের জন্য শত্রু শত্রু খেলা
×

প্রিয় দলের সমর্থন নিয়ে এ সময়ে পরম বন্ধুদের মধ্যেও চলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা... মডেল : শাকিব, রিফাত, নিশাত, রাহিনুর ও নাবিয়া; পোশাক : কিটোরা; ছবি : ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

আশিক মুস্তাফা

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে শুরু হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজনাকর, প্রতিদ্বন্দ্বিতার শ্রেষ্ঠত্বের মোড়ানো বিশ্বকাপ ফুটবল। পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রুনি, এমবাপ্পে কিংবা নেইমারদের জাদুকরি কারুকাজ প্রদর্শনীর এই মহাযজ্ঞ থেকে এবার আসছেন আগামীর কোন মহানায়ক? তরুণরাই বা আড্ডায় কাকে, কোন দেশকে এগিয়ে রাখছেন এবার; বিশ্বকাপ নিয়ে তারুণ্যের উন্মাদনা বাড়িয়ে দিতে সাহস–এর এই আয়োজন। লিখেছেন আশিক মুস্তাফা

সাত সাগর তেরো নদী পারের দেশে এবারের আয়োজন। তাও তিন দেশে। এক রঙ্গমঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছে সেসব দেশে। অভিনেতারা আমাদের দেশের কেউ নন, কাছে পিঠে এই দক্ষিণ এশিয়ারও কেউ নেই। তারপরও আমরা শিহরিত। রেফারির বাঁশি বেজে উঠলেই শুরু হবে নাটক। আমরা যারা দর্শক তাদের কখনও বা হাসার পালা, কখনও কাঁদার, আবার কখনও বা নিজেকেই মাঠের খেলোয়াড় ভেবে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধানোর। আসলে ভণিতা করার কোনো মানেই ছিল না। সবাই জানে, ২০২৬ সালের ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোতে ফিরছে তামাম দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তেজনাকর, প্রতিদ্বন্দ্বিতার শ্রেষ্ঠত্বের মোড়ানো বিশ্বকাপ ফুটবল। কত জাদুকরই তো এলো গেল। নিছকই মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, এমবাপ্পে, নেইমার কিংবা হালান্ডের জাদুকরি কারুকাজ প্রদর্শনীর সাধারণ এক আয়োজন হলেও দরকার ছিল না এত শব্দ খরচের। কিন্তু ব্যাপারটি অনেক আগেই দরজা গলিয়ে পৌঁছে গেছে সবার অন্দর মহলে। তার মধ্যে আয়োজনটি যখন একেবারেই সামনে তখন সে সুযোগটি কেউ ছাড়বে কেন।
মোটা দাগে বলতে গেলে এ দেশে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার বাইরে সমর্থকশিবির খুব বড় নয়। তবে ফ্রান্স, জার্মানি, হালের স্পেন, মরক্কো  সমর্থকদেরও শোডাউন চোখে পড়ে। সবুজ মাঠের বুকে গোলাকার এ চর্মবস্তু নিয়ে জাদু দেখাতে একেক যুগে আসেন একেকজন মহানায়ক। এবার আসছেন কে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর বলে কথা
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ নিছক একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ইতিহাসের বাঁকবদলের মুহূর্ত। ২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এই মহাযজ্ঞ। আয়োজক তিনটি দেশ–যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। অংশগ্রহণকারী দল ৪৮টি। মোট ম্যাচ হবে ১০৪টি। আয়োজক শহর ১৬টি। এই মহাযজ্ঞ চলবে ৩৯ দিনব্যাপী। আগের আসরগুলোতে ৩২টি দল অংশ নিত, এবার সেটি বেড়ে হয়েছে ৪৮। ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিটি দল তিনটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলবে। মোট ম্যাচের সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪টি  অর্থাৎ এবারের ফাইনালে ওঠা দলকে জিততে হবে পুরো আটটি ম্যাচ। উদ্বোধনী ম্যাচ হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায়, আর ফাইনাল নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। মেসি-রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা সম্ভবত এই আসরেই শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে 
পা রাখবেন। 

ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের রং
বাংলাদেশের যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলে বিশ্বকাপের মৌসুমে মনে হবে যেন একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল উৎসবের মাঝে পড়ে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর জানালায়, বারান্দায় আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল পতাকা আর ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ পতাকা পাশাপাশি উড়তে দেখা যায়। হলের দরজায়, দেওয়ালে সেঁটে থাকে প্রিয় তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, মেসি, নেইমার, এমবাপ্পের ছবি। শুধু পতাকা বা জার্সিতেই থামে না উৎসাহ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা মিলে তৈরি করেন সমর্থক গোষ্ঠী। ব্রাজিল সমর্থকরা হলুদ রঙের টি-শার্ট পরে দলবেঁধে খেলা দেখতে যান, আর্জেন্টিনাপন্থিরা মাথায় 
বাঁধেন নীল-সাদা স্কার্ফ। 
রুমে রুমে ঝোলে পছন্দের খেলোয়াড়ের পোস্টার, মোবাইলের ওয়ালপেপার বদলে যায়, সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইল পিকচারে জায়গা নেয় প্রিয় দলের লোগো। বিশ্বকাপের নতুন জার্সি কিনতে নিউমার্কেটে ছোটাছুটিও কম নয়!

এবার কোন দল নিচ্ছে?
বিশ্বকাপ মানেই শুধু খেলা নয়, বিশ্বকাপ মানে পূর্বাভাস বা ভবিষ্যদ্বাণীর মহাউৎসব! ম্যাচ শুরুর আগেই চায়ের কাপে ঝড় ওঠে: ‘এবার ব্রাজিল নেবে’, ‘না না, মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা কী করবে!’, ‘ফ্রান্সকে ঠেকায় কে?’ এই বিতর্কই হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ২০২৬-এ সেই উন্মাদনা আরও কয়েক গুণ বেশি, কারণ এবার দলের সংখ্যা ৪৮, প্রেডিকশন বা পূর্বাভাসের মাঠও তাই হয়েছে অনেক বড়। 
বিশ্বের নামকরা ক্রীড়া বিশ্লেষক সংস্থা অপটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সবার আগে রেখেছে স্পেনকে; ১৬ শতাংশের বেশি সম্ভাবনা নিয়ে। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, রদ্রির মতো তরুণ প্রতিভার সমাহারে স্পেন এবার সত্যিই ভয়ংকর সুন্দর। ঠিক পেছনেই আছে ফ্রান্স, এমবাপ্পের নেতৃত্বে সাড়ে বারো শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে। বাজির বাজারেও ছবিটা প্রায় একই!

যেখানে পূর্বাভাস মানেই আবেগ
কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসগুলোতে এআই-এর পূর্বাভাস বা পূর্বাভাস বা ভবিষ্যদ্বাণী পাত্তা পায় না। এখানে চলে আবেগ দিয়ে। আর্জেন্টিনার সমর্থক জানেন, মেসি থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। ব্রাজিল ভক্ত বলবেন ‘ভিনিসিউস এবার যা ফর্মে আছেন, ট্রফি আসছেই।’ আর ফ্রান্সের দলকে ‘হুমকি’ বলে মানলেও প্রিয় দলের পক্ষে যুক্তির শেষ নেই!

বড়পর্দায় লাখো হৃদয়ের স্পন্দন
বিশ্বকাপ এলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর হয়ে ওঠে তারুণ্যের তীর্থস্থান। বড়পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয় সেখানে, আর শত শত শিক্ষার্থী গ্যালারির মতো ভিড় জমান। গোল হলে যে উচ্ছ্বাস ওঠে, তা যেন পুরো এলাকায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। টিএসসির পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া, ক্যাম্পাসের খোলা মাঠ বা হলের কমন রুমে লাগানো হয় বড়পর্দা। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, দেশের প্রান্তে প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই উৎসবের ছবি। মধ্যরাতের ম্যাচও দেখা হয় চোখ কচলে, পরের দিন পরীক্ষা থাকলেও সে বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়! শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নয়, পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের পাবলিক স্কোয়ার পর্যন্ত, বিশ্বকাপের রাতগুলোতে সারাদেশে জমে ওঠে একটি অদ্ভুত সম্মিলনী উৎসব। বাংলাদেশ নিজে বিশ্বকাপে খেলে না। তবে এই সত্য কখনও বাংলাদেশের তরুণদের উৎসাহে ভাটা আনতে পারেনি। অন্য দেশের জার্সি গায়ে, অন্য দেশের পতাকা হাতে, তারা ঢেলে দেন নিজেদের সমস্ত আবেগ। কারণ, ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয় এটি একটি অনুভূতি, একটি উৎসব, একটি প্রজন্মের সঙ্গে আরেকটি প্রজন্মের মেলবন্ধনের সুতো।

স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় আগামীর বাংলাদেশ 
তবু মনের কোণে একটি সুপ্ত বেদনা থেকেই যায়। যখন ৪৮টি দেশের পতাকা বিশ্বকাপের মাঠে উড়তে থাকে, তখন লাল-সবুজ পতাকাটি সেখানে থাকে না। যে দেশের তরুণরা গভীর রাতে ঘুম ছেড়ে উঠে মেসির জন্য গলা ফাটায়, নেইমারের গোলে রাস্তায় নেমে উৎসব করে, সেই দেশের নিজের কোনো দল নেই সেই মাঠে। এই বাস্তবতা অনেকটা ভোজবাজির মতো, এত আনন্দের ভেতরেও একটু নীরব হাহাকার! তবে আমাদের তরুণরা স্বপ্ন দেখতে জানে। তারা বিশ্বাস করে, একদিন  ক্যাম্পাসের বড়পর্দায় ভেসে উঠবে দেশের নাম। লাল-সবুজ জার্সি পরা এগারোজন তরুণ দৌড়াবে বিশ্বকাপের মাঠে। সেদিন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা নয়; ক্যাম্পাসের প্রতিটি বারান্দায় উড়বে কেবল একটিই পতাকা: যার লাল বৃত্ত আগলে রাখবে সবুজ বাংলাদেশ!

আরও পড়ুন

×