ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

গণতন্ত্র ও আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে

গণতন্ত্র ও আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে
×

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতিণ্ডলীর সদস্য বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্র হলো একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনীতি হলো অর্থনীতিরই ঘনীভূত প্রকাশ। একটা দেশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অর্থনীতির চরিত্রই নির্ধারণ করে তার রাজনীতির স্ট্রাকচার বা কাঠামো কী ধরনের হবে। সে কারণে খুবই স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যদি ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারী আমলের মতো রেখে দেওয়া হয়, তাহলে সেই লুটপাটের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তির ওপরে গণতন্ত্রের ফুল কোনো দিন ফোটানো সম্ভব নয়। 

দেশে গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হয়েছে একটা বৈষম্যমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নিরঙ্কুশভাবে এই দেশে চালু হোক, সেটাও ছিল গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জনগণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার, রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে এন্তার তর্ক-বিতর্ক চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের ক্ষেত্রে একটা পদক্ষেপও গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি। অথচ সেটা নিতে হলে কোনো সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনও নেই। 

যেমন এই দেশে শ্রমজীবী মানুষের জন্য ‘ন্যূনতম জাতীয় মজুরি’ থাকা উচিত। এটা বহুদিনের দাবি শ্রমিকদের। এই শ্রমিক এবং মানুষ সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় জীবন দিয়েছে এই গণঅভ্যুত্থানকালে। কিন্তু তাদের অতি সাধারণ এই দাবি এখন পর্যন্ত আদায় হয়নি। সরকারিভাবেই জানানো হয়েছে যে গত এক বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে যেভাবে দশকের পর দশক ধরে গরিবের সম্পদ ধনীর দিকে প্রবাহিত হতো– সেই ধনী অভিমুখীন সম্পদের প্রবাহ অব্যাহতই শুধু নয়, সেটাকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনার নানা রকম চেষ্টা চলছে। সুতরাং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যদি আমরা এটা উল্টিয়ে দিয়ে ধনীর সম্পদ গরিবের কাছে নিয়ে যাওয়ার পাল্টা ব্যবস্থা না করতে পারি এবং অর্থনীতিকে গরিব মধ্যবিত্তের স্বার্থ অভিমুখীন না করতে পারি, তাহলে বৈষম্য কোনো দিনই নিরসন হবে না। 

আমরা যে কথাটা সবসময় ভুলে যাই এবং আমাদের সংবিধানেও যে কথাটা স্পষ্টভাবে লেখা আছে– ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। বারবার ইতিহাসে যা ঘটে তা হলো, জনগণ রাজপথে নেমে লড়াই করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। ইতিহাসের নায়ক ও মহানায়ক হয় জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জনগণই সশস্ত্রভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হয়ে দেশকে স্বাধীন করেছে। এত বড় যুগান্তকারী ঘটনা আমাদের জাতির ইতিহাসে এর আগে হয়নি। এরপর এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান– এ সবকিছু সংগঠিত হলো ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। 

অথচ এবারের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই দাবি করা হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে একজন মাস্টারমাইন্ড ছিল এবং এটা ছিল মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। এই বয়ান এই ন্যারেটিভ কিন্তু আমাদের গণতন্ত্র উত্তরণের পথে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করেছে। মানুষের ভেতরে এ রকম ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, “তোমরা ঘরে চুপচাপ বসে থাকলেও যদি একটা ‘মাস্টার মাইন্ড’ কোনোভাবে পাওয়া যায় এবং সে যদি অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করে তাহলে সেই মাস্টার মাইন্ডই তোমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে।” এভাবে যে জনতা গণঅভ্যুত্থানের ফসল ফলালো, সেই জনতার প্রতিনিধি বলে দাবিদার কয়েকজন এসে তা দখল করে নিয়েছে। তাদের কেউ কেউ আবার নতুন রাজনৈতিক দলও গঠন করে ফেলেছে। জনগণের ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে ‘তাদের প্রতিনিধি’ বলে দাবিদারদের দ্বারা এভাবে প্রতিস্থাপন করা একটা ষড়যন্ত্র এবং প্রতারণামূলক ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। রবীন্দ্রনাথের সেই ‘ভক্তিভাজন’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল– 
‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। 
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, 
মূর্তি ভাবে আমি দেব– হাসে অন্তর্যামী।’ 

নতুন এই গোষ্ঠী আবার ক্ষমতাসীন পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতই সম্পদের পাহাড় গড়া এবং ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করার চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে পুরোনো ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থাই ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে গণতন্ত্র নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে যাচ্ছে। তারপরও আমি বলব, এই সমস্যাগুলোকে ছাড়িয়ে ইতিহাসে ভবিষ্যতে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এই পরবর্তী অভ্যুত্থান এমন হবে, যেখানে এতদিন পর্যন্ত যে আমরা বিজয় অর্জন করি কিন্তু বিজয় ধরে রাখতে পারি না– সে ক্ষেত্রে এবার বিজয় অর্জিত হবে এবং সেই বিজয় ধরে রাখার ব্যবস্থাও করা হবে। এবার ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান নয়, হবে শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের অভ্যুত্থান। তারা ছাত্র-জনতা, বুদ্ধিজীবী এবং সৎ মানুষ সবাইকে একত্রে নিয়ে সেই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করবে। তখনই কেবল একটা নতুন যুগের সূচনা আমরা করতে পারব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার। এই যে সব দলের স্বাক্ষরে জুলাই জাতীয় সনদ হতে যাচ্ছে, সেটাও তো কয়েকজন পণ্ডিতের লেখা কিছু শব্দমালা বৈ কিছু নয়। সেখানে জনগণকে ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্যাভিমুখী কোনো এজেন্ডা নেই। সে কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূরণে যত দ্রুত সম্ভব জনগণকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ দিতে হবে। জনগণের প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন করে এবং জনগণের সমর্থনপুষ্ট সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের সম্মতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে নির্বাচিত সংসদে আলোচনা করে সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো সামনে আনতে হবে। সংবিধান সংস্কার করে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান– এই বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনায় আনতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। 

বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা বাস্তবায়নের প্রবণতা ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বঙ্গোপসাগর ও বন্দরগুলো সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। গোপন চুক্তি করে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের দাপটকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। একমাত্র জনগণের সংগঠিত শক্তির পক্ষেই সম্ভব এসব থেকে দেশকে রক্ষা করা। সেটা করতে হলে মানুষকে আবারও রাজপথে নামতে হবে। আমরা সেই নতুন পথ রচনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সেই পথে জনগণকে ডাক দিচ্ছি। 

আগামী দিনের এই নতুন সংগ্রামে দেশের বামপন্থিরা এবার আর সাইডলাইনে থাকবে না। ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে তারা এবার সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে। আমরা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে জনগণকে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামাতে নভেম্বরের ১৪ তারিখে ঢাকা সমাবেশ করছি। এর আগে আমরা পক্ষকাল ধরে গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় এক লাখ কিলোমিটার পদযাত্রা করব। দুই হাজার হাটে হাটসভা করব। ইতোমধ্যে আমাদের ঝটিকা অভিযান শেষ হয়েছে। সব জেলায় কর্মিসভা এবং একই দিনে প্রায় ১০০টি সংগঠিত পথসভা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা সব মানুষকে সংগঠিত করার কাজে রয়েছেন। এবারের সংগ্রামের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত তথা ফেব্রুয়ারির শুরুতে নির্বাচন, বৈষম্যের অবসান এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়। আরও বড় লক্ষ্য হলো লুটপাটকারী ও সাম্প্রদায়িক উগ্র ডানপন্থি শক্তির ষড়যন্ত্র পরাভূত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের অনুসৃত অর্থনীতির গোটা ব‍্যবস্থা পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের জনআকাঙ্ক্ষার ধারায়, অর্থাৎ সমাজতন্ত্র অভিমুখী অর্থনীতি কায়েম করা। প্রশ্ন উঠতে পারে– নতুন এই সংগ্রাম কার দ্বারা ও কীভাবে সংগঠিত হবে? সেই শক্তি কোথায়? এর জবাবে বলব– আগামী দিনে আমরা উপযুক্ত চরিত্রের রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তি সবাইকে নিয়ে একটা বৃহত্তর ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ তথা ‘রংধনু কোয়ালিশন’ করব। যেটাকে আমি বলেছিলাম নয়া যুক্তফ্রন্ট। এই যুক্তফ্রন্ট গঠন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আমরা জাতীয় কনভেনশন করে নানাভাবে নিগৃহীত তৃণমূলের সমস্ত শ্রমিক-কৃষক, মেহনতি মানুষ এবং বিশেষ করে পাহাড়ি, আদিবাসী, রবিদাস, হরিজন, মাজারপন্থি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন– সবাইকে ডেকে, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করে সার্বিক জাতীয় পুনর্জাগরণের একটা ‘জনগণের চার্টার’ রচনা করব। সেই চার্টার বাস্তবায়নের জন্য আমরা বৃহত্তর সংগ্রামে নেমে যাব। 

মোদ্দাকথা, বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদা মেটাতে হলে জনগণের আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় একটা প্রগতিশীল বামপন্থি গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক বিকল্প শক্তি সমাবেশকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকার গঠন করতে হবে। একটি সমাজবিপ্লব সংগঠিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিকসহ জনগণের সার্বিক সমস্যা-সংকট মোচনে এর বিকল্প এই মুহূর্তে আর কিছু নেই। 

আরও পড়ুন

×