দ্রোহ ও মানবতার সুরে ছায়ানটে নজরুল সন্ধ্যা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের (আইজিসিসি) উদ্যোগে ‘নজরুল সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠিত হয় সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য, প্রেম ও স্বাধীনতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি ঘিরে ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘নজরুল সন্ধ্যা’। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের সম্মিলনে সাজানো এ আয়োজনে উঠে আসে জাতীয় কবির সৃষ্টির নানা অনুষঙ্গ।
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে গতকাল বৃহস্পতিবার এ আয়োজন করে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এ ছাড়া শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নজরুলকে ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম শক্তিশালী ‘সেতু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নজরুল মানুষের সম্মিলিত চেতনাকে বদলে দেওয়ার জন্য লড়াই করেছেন। কবিকে স্মরণের পাশাপাশি দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী নজরুলের মানবতাবাদী দর্শনের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ধর্ম ও বর্ণের বিভাজন অতিক্রম করে নজরুল মানুষের কবি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালকে সরকার ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে জাতীয় কবির জীবন ও সৃষ্টি ঘিরে এ বছরের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতেই নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা। তাঁর কণ্ঠে নজরুলের কালজয়ী গানগুলো সন্ধ্যার আবহকে করে তোলে সুরময়। কখনও গানের কথায় উঠে আসে প্রেম ও বিরহ; কখনও প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নজরুলের গানের বহুমাত্রিকতা শিল্পীর পরিবেশনায় শ্রোতাদের কাছে নতুন করে ধরা দেয়।
এরপর আবৃত্তি করেন অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মোহময়ী ও দৃঢ়কণ্ঠে নজরুলের কবিতার উচ্চারণে ফুটে ওঠে দ্রোহ, সাম্য ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। শব্দের তীব্রতা ও আবেগের ওঠানামায় কবিতাগুলো যেন মঞ্চে নতুন প্রাণ পায়।
নৃত্য পর্বে নজরুলের সৃষ্টিজগতের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেন মণিপুরি নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার সামিনা হুসাইন প্রেমা। নৃত্যভঙ্গি, ছন্দ ও সংগীতের সমন্বয়ে তিনি কবির সৃষ্টির আবেগকে দৃশ্যমান করে তোলেন। নজরুলের গানের অন্তর্নিহিত প্রেম, প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতির সঙ্গে নৃত্যের এই মেলবন্ধন পরিবেশনায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের সম্মিলনে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে নজরুলের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতার এক সাংস্কৃতিক পাঠ। তাঁর লেখায় যে মানবতা, সাম্য, সম্প্রীতি, প্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার ফিরে আসে; শিল্পীদের পরিবেশনায় তারই নানা রূপ ফুটে ওঠে। দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসাও কুড়ায় পরিবেশনাগুলো।
নজরুলের সৃষ্টি ঘিরে আয়োজিত এ সন্ধ্যায় স্মরণ করা হয় শুধু একজন কবিকে নয়; তাঁর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত একটি মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেও। দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোচনার পাশাপাশি গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের এই আয়োজন নজরুলের সৃষ্টির চিরন্তন আবেদনকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
- বিষয় :
- সংস্কৃতি