ভেষজ চায়ের গুণাগুণ
.
ইসরাত জাহান ডরিন
প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৪ | ২২:৩৬
চা শব্দটি শুনলেই মন সতেজ হয়ে ওঠে। সকালে এক কাপ গরম চায়ের চুমুক শুধু ক্লান্তি দূর করে না; শরীর-মন উজ্জীবিত করে তোলে। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই পানীয় শুধু স্বাদেই অনন্য নয়, এর পুষ্টিগুণও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
চায়ের উৎপত্তির ইতিহাস
চায়ের উৎপত্তির ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। চীনের সম্রাট শেননং এক দিন গরম পানির পাত্রে একটি পাতা পড়ে যেতে দেখেন। সেই পানীয় পান করার পর তাঁর ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, এই পাতায় রয়েছে বিশেষ ভেষজ গুণ। এরপর থেকেই চা পাতা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রিক দেবী থিয়ার নামে এর নাম রাখা হয় ‘টি’, যা চীনে উচ্চারণ হতে হতে হয়ে যায় ‘চা’।
চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা
চীনা দার্শনিক লাৎসে চা-কে ‘মহৌষধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। আধুনিক গবেষণায়ও চায়ের অসংখ্য উপকারিতার প্রমাণ মিলেছে। চায়ে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে, রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। চা শরীরকে সতেজ ও উদ্যমী রাখতেও সাহায্য করে।
বিভিন্ন ধরনের চায়ের আলাদা গুণাগুণ রয়েছে।
ব্ল্যাক টি বা কালো চা: এটি ক্যাফেইন, পটাশিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এটি মানসিক অবসাদ দূর করে এবং মনকে প্রফুল্ল রাখে।
গ্রিন টি: এতে থাকা পলিফেনল ওজন কমায়, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে পাকস্থলী, মূত্রথলির ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে। এটি মুখের সংক্রমণ প্রতিরোধেও কার্যকর।
হলুদ চা, আদা চা এবং অন্যান্য ভেষজ চা: এগুলো শরীরের ডি-টক্সিফিকেশনে সহায়তা করে এবং সজীবতা ফিরিয়ে আনে।
কাঁচা চা পাতার পুষ্টিগুণ
কাঁচা চা পাতা সরাসরি খাওয়ার ঐতিহ্য আমাদের দেশে বহু পুরোনো। এটি অপ্রক্রিয়াজাত হওয়ায় প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান অক্ষুণ্ন থাকে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: কাঁচা চা পাতায় পলিফেনল রয়েছে, যা কোষের ক্ষতি রোধে কার্যকর।
ভিটামিন ও মিনারেলস: এতে থাকা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স বজায় রাখে।
ক্যাফেইন ও ফাইবার: ক্যাফেইন মনোযোগ বাড়ায় এবং ফাইবার হজমে সহায়তা করে।
কাঁচা চা পাতা খাওয়ার উপায় ও সতর্কতা
চা শ্রমিকরা ভাত বা মুড়ির সঙ্গে কাঁচা চা পাতা মিশিয়ে খেয়ে থাকেন। এটি একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী, অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর। স্বাদ বাড়াতে লবণ, লেবুর রস বা সরিষার তেল মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত কাঁচা চা পাতা খেলে এতে থাকা ট্যানিন হজমে সমস্যা করতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
রূপচর্চায় চায়ের ব্যবহার
lচা পানীয় হিসেবেই নয়, রূপচর্চায়ও কার্যকর।
lব্ল্যাক টি ত্বকের পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং বলিরেখা প্রতিরোধ করে।
lগ্রিন টি ক্লিনজার হিসেবে ত্বকের জমে থাকা ময়লা দূর করে এবং ত্বককে করে তোলে কোমল ও উজ্জ্বল।
চা জীবনযাপনের অংশ করে তুলেছে। এক কাপ চা শুধু শরীরকে চাঙা করে না; এটি মনকেও শান্তি দেয়। তাই প্রতিদিন চা পানের অভ্যাস আপনাকে সুস্বাস্থ্য এবং জীবনের প্রশান্তি এনে দিতে পারে। v
লেখক: পুষ্টিবিদ, লাইফ কেয়ার মেডিকেল সেন্টার
- বিষয় :
- ভেষজ চা
