ঠান্ডায় প্রবীণদের যত্ন
ঠান্ডা হাওয়ায় প্রবীণদের সুস্থতায় সঠিক পরিচর্যা জরুরি
ভূঁইয়া শফি
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রকৃতিতে হিমেল হাওয়ার দাপটে হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে। তরুণদের কাছে শীত আমেজ আর উৎসবের ঋতু হলেও, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের জন্য এ সময়টি বেশ সংবেদনশীল। বয়সের ভারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসা এবং মেটাবলিজম ধীর হয়ে যাওয়ার কারণে ঠান্ডাজনিত নানা জটিলতা তাদের ঘিরে ধরে। সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে বাতের ব্যথা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি–শীত মানেই প্রবীণদের জন্য বাড়তি সতর্কতা। প্রবীণরা পরিবারের বটবৃক্ষ। শীতের রুক্ষতা যেন তাদের স্পর্শ করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজন সামান্য সচেতনতা আর অফুরন্ত ভালোবাসা। সঠিক পুষ্টি, শরীরচর্চা আর মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারলেই এ শীতে তারা সুস্থ থাকতে পারবেন। শীতের এ দিনগুলোয় প্রবীণদের কীভাবে যত্নে রাখবেন এবং তাদের সুস্থতায় খাবারের কেমন হওয়া উচিত তা জেনে রাখুন।
শারীরিক উষ্ণতা ও দৈনন্দিন সতর্কতা
শীতকালে শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হাইপোথার্মিয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া রোধ করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন–
পোশাকের লেয়ার: একটি ভারী কাপড়ের চেয়ে কয়েকটি পাতলা পোশাক লেয়ার করে পরা বেশি কার্যকর। এতে শরীরের তাপ বাইরে বের হতে পারে না। পা এবং কান ঢেকে রাখতে মোজা ও টুপি ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
রোদের ছোঁয়া: প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট গায়ে রোদ লাগানো উচিত। এটি যেমন শরীর গরম রাখে, তেমনি হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন-ডি সরবরাহ করে।
কুসুম গরম পানির ব্যবহার: গোসল থেকে শুরু করে হাত-মুখ ধোয়া–সব ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা নিরাপদ। তবে খুব বেশি গরম পানি যেন ত্বকের আর্দ্রতা কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ব্যায়াম ও চলাফেরা
ঠান্ডায় হাত-পায়ের জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়, যাকে আমরা বাতের ব্যথা বলি। এই ব্যথা এড়াতে ঘরের ভেতরেই হালকা পায়চারি বা কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা মুক্তহস্ত ব্যায়াম করা প্রয়োজন। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থেকে হাত-পা সচল রাখলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।
পুষ্টিবিদের পরামর্শ:
প্রবীণদের শীতকালীন পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিডিএন পল্লবী ডায়াবেটিক সেন্টার ও লাইফ কেয়ার মেডিকেল সেন্টারের পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন জানান, শীতকালে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যাওয়ায় প্রবীণরা স্বাভাবিকের তুলনায় কম পানি পান করেন, যা ডিহাইড্রেশন, কোষ্ঠকাঠিন্য ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাঁর মতে, এ সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সুষম ও পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, প্রবীণদের জন্য শীতকালীন ডায়েট এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে পর্যাপ্ত শক্তি জোগাবে, অন্যদিকে সংক্রমণ ও প্রদাহের বিরুদ্ধে শরীরকে সুরক্ষা দেবে। শীতকালে প্রবীণদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাবাবের তালিকায় যা থাকতে পারে–
ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড: শীতকালে বাতের ব্যথা, জয়েন্ট স্টিফনেস ও হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। সামুদ্রিক মাছ, আখরোট ও তিল ওমেগা-৩-এর ভালো উৎস, যা প্রদাহ কমাতে এবং হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য রক্ষায় বেশ কার্যকর। সপ্তাহে অন্তত দুদিন মাছ রাখতে পারেন।
ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: শীতে সর্দি-কাশি ও ভাইরাল সংক্রমণ এড়াতে খাদ্য তালিকায় লেবু, কমলা, আমলকী ও পেয়ারা রাখা প্রয়োজন। এসব ফল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি গাজর, ব্রকলি ও পালং শাকের মতো রঙিন শাকসবজি বিটা-ক্যারোটিন সরবরাহ করে; যা ফুসফুস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
উষ্ণ পানীয় ও পর্যাপ্ত পানি: শীতকালেও শরীরের পানির চাহিদা কমে না। তাই নিয়মিত কুসুম গরম পানি পান করা জরুরি। পাশাপাশি ঘরে তৈরি সবজি স্যুপ বা চিকেন স্টু শরীর হাইড্রেটেড রাখার পাশাপাশি ভেতরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সহজপাচ্য খাবার: শীতে হজম ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও ভাজাভুজি খাবার এড়িয়ে চলাই উত্তম। এর পরিবর্তে ওটস, ডাল-সবজি খিচুড়ি কিংবা নরম ভাত প্রবীণদের জন্য বেশি উপযোগী ও আরামদায়ক।
মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল
শীতের ছোট দিন আর দীর্ঘ রাত অনেক সময় একাকিত্ব বা বিষণ্নতা তৈরি করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিজনাল এফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ বলা হয়। প্রবীণরা যেন নিজেকে একা মনে না করেন, সে জন্য পরিবারের সদস্যদের তাদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটাতে হবে। পুরোনো গল্প করা, একসঙ্গে বসে টিভি দেখা বা ইনডোর গেমস খেলা তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখবে।
নিয়মিত চেকআপ ও জরুরি প্রস্তুতি
যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অ্যাজমা আছে, শীতে তাদের রিডিং ঘন ঘন ওঠানামা করতে পারে। তাই নিয়মিত প্রেশার ও সুগার চেক করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডোজ সমন্বয় করা জরুরি। জরুরি প্রয়োজনে ইনহেলার, নেবুলাইজার বা প্রয়োজনীয় ওষুধ যেন হাতের নাগালে থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিন।
- বিষয় :
- শীত
