ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জেমস বন্ড আইল্যান্ডে

জেমস বন্ড আইল্যান্ডে
×

অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে দ্বীপটি খুবই জনপ্রিয়

রোজী আরেফিন 

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনেকদিন ধরে থাইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো অবশেষে। পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি থাইল্যান্ডের বিভিন্ন দ্বীপে। এর মধ্যে একটি হলো জেমস বন্ড আইল্যান্ড। জায়গাটার সৌন্দর্য এতদিন শুধু ছবিতেই দেখেছি, বাস্তবে এর সৌন্দর্য মনে গেঁথে থাকার মতো। 

থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর কোথায় কোথায় যাব আগেই পরিকল্পনা করে নিয়েছিলাম। সেই অনুযায়ী একদিন ফুকেট শহর থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে নৌকা পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম জেমস বন্ড আইল্যান্ডে। ফাং এনগা উপসাগরের শান্ত জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দ্বীপটি প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। চারদিকে সবুজাভ পানির ওপর খাড়া চুনাপাথরের পাহাড়গুলো এমনভাবে উঠে এসেছে, যেন বহু বছর ধরে নিঃশব্দে এরা নিজেদের কত না বলা গল্প বলে যাচ্ছে। দ্বীপটির পাশে অবস্থিত কো তাপু পাথরটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে–পাতলা, সুউচ্চ, একেবারে পানির বুক থেকে উঠে দাঁড়ানো এই শিলাখণ্ডটিই জেমস বন্ড আইল্যান্ডকে বিশ্বজুড়ে আলাদা এক পরিচিতি দিয়েছে। 

এই জায়গাটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায় ১৯৭৪ সালে জেমস বন্ড সিরিজের নবম ছবি ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে বাস্তবে দ্বীপটির সৌন্দর্য মিলে যাওয়ায় জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 

আয়তনের দিক থেকে দ্বীপটি খুব বড় নয়। এটি মূলত দুটি চুনাপাথরের অংশ নিয়ে গঠিত-খাও ফিং কান (মূল দ্বীপ) এবং তার পাশে আলাদা দাঁড়িয়ে থাকা কো তাপু নিয়ে।
এই দ্বীপের গঠন প্রক্রিয়াটাও বেশ চমৎকার! লাখ লাখ বছর ধরে সমুদ্রের পানি, বাতাস আর প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে এই চুনাপাথরের পাহাড়গুলো এমন অদ্ভুত আকৃতি পেয়েছে। বিশেষ করে কো তাপু শিলাখণ্ডটির নিচের অংশ সরু আর ওপরের অংশ চওড়া; যা দেখতে একদম উল্টো গাছের মতো লাগে। জোয়ার-ভাটার প্রভাব এবং পানির ক্ষয়ের কারণেই এই শিলাখণ্ডটির এমন আকৃতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

দ্বীপের এক পাশে ছোট একটি বালুকাময় সৈকত, অন্য পাশে খাড়া পাথুরে দেয়াল, যেগুলো অনেক জায়গায় এমনভাবে ঝুলে আছে যে নিচে দাঁড়ালে মনে হয় মাথার ওপর ঝুঁকে পড়েছে। এই ঝুলন্ত অংশগুলোই জায়গাটিকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে এবং অনেক পর্যটক এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পছন্দ করেন। 
আরও একটি মজার বিষয় হলো–এখানে নৌকা থামার পর নির্দিষ্ট কিছু পথ ধরে হাঁটার ব্যবস্থা আছে, যাতে পর্যটকরা দ্বীপের বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখতে পারেন। নিরাপত্তার জন্য কিছু জায়গায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে, কারণ পাথরের অংশ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পুরো জায়গাটিকে খুব যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। 

এখানে স্থায়ীভাবে কেউ বসবাস করে না। এটি মূলত একটি সংরক্ষিত পর্যটন এলাকা, তাই হোটেল বা বাসাবাড়ি নেই। তবে দ্বীপের ছোট অংশে অস্থায়ীভাবে কিছু দোকান বসে। সেখানে স্থানীয় বিক্রেতারা সুভ্যেনির, শেল দিয়ে বানানো অলংকার, ছোটখাটো হস্তশিল্প, খাবারের জন্য টুকটাক জিনিস বিক্রি করে। এখানে বড় কোনো বাজার নেই, কিন্তু পর্যটকদের জন্য হালকা কেনাকাটার সুযোগ আছে। 
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে এই জায়গা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়। বর্ষার পর প্রকৃতি তখন ধুয়ে-মুছে একদম সতেজ থাকে, সবুজ রংটা অনেক বেশি গাঢ় লাগে। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আকাশ থাকে পরিষ্কার, আবহাওয়া আরামদায়ক, তাই সমুদ্রযাত্রাও বেশ স্বস্তিদায়ক হয়। এই সময়ে পর্যটকের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু জায়গার বিস্তৃতি এমন যে ভিড় খুব একটা বিরক্তিকর লাগে না। 

যাই হোক, দ্বীপে পৌঁছানোর পর সবচেয়ে ভালো লেগেছে আশপাশের নীরবতা। বড় বড় পাথুরে পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকলে এক ধরনের শান্তি কাজ করে। কাছাকাছি কিছু জায়গায় কায়াকিং করার সুযোগ আছে, যেখানে সরু জলপথ দিয়ে ভেতরের লেগুনে ঢোকা যায়। সেখানে আলো-ছায়ার খেলা আর পানির স্বচ্ছতা পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও আলাদা করে তোলে। 
এই ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো দিক হলো–শুধু জেমস বন্ড আইল্যান্ডই নয়, একই ট্রিপে আশপাশের আরও কিছু অসাধারণ জায়গা দেখা যায়। সাধারণত ট্রিপগুলো হং আইল্যান্ড-এর লুকানো লেগুন, পানাক আইল্যান্ডের গুহা আর সরু জলপথ, এমনকি ভাসমান মুসলিম গ্রাম কো প্যানইতেও নিয়ে যায়, যেখানে স্থানীয় জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখা যায়। অনেক ট্রিপে একটি নিরিবিলি সৈকতেও কিছু সময় কাটানোর সুযোগ থাকে। 

জেমস বন্ড আইল্যান্ডের পুরো জায়গাটির মধ্যে একটা সিনেমাটিক আবহ আছে। সেটি কৃত্রিম নয়, পুরোটাই একদম প্রকৃতির তৈরি। তাই যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন, বা একটু ভিন্ন ধরনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খোঁজেন তাদের জন্য এই জায়গাটি খুব সহজেই মনে গেঁথে যায়। 
থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে সাধারণত ডে ট্রিপে এখানে যাওয়া হয়। গ্রুপ ট্রিপে জনপ্রতি বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা লাগে, যেখানে হোটেল থেকে আনা-নেওয়া, খাবার, গাইড এবং কায়াকিং অন্তর্ভুক্ত থাকে। ব্যক্তিগত নৌকা নিলে খরচ আরও বেশি হয়, সাধারণত ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি। দলভেদে ভাগ হয়ে যায়। তবে এক দিনের ভ্রমণেই এখানের মূল আকর্ষণগুলো ঘুরে দেখা সম্ভব। 

আরও পড়ুন

×