ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হাতিদের অনাথ আশ্রমে একদিন

হাতিদের অনাথ আশ্রমে একদিন
×

তানিয়া এ্যানি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আতিথেয়তা, পর্যটকবান্ধব আচরণ এবং একইসঙ্গে জল-পাহাড়-ইতিহাস-ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের জন্য শ্রীলঙ্কা বেশ জনপ্রিয় পর্যটকদের কাছে। পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা ভিন্ন প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে এবার তাই ছুটলাম শ্রীলঙ্কায়।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও অনেকেই হয়তো জানেন না, শ্রীলঙ্কার পিন্নাওয়ালাতে আছে এলিফ্যান্ট অরফানেজ। ছোটবেলায় এই পিন্নাওয়ালা অরফানেজের গল্প শুনেছিলাম আমার ভাইয়ের কাছে। সেই থেকে মাথায় গেঁথে ছিল কখনও শ্রীলঙ্কা গেলে আর কোথাও যাই না যাই এ জায়গায় যেতেই হবে।
১৯৭৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং কেবল হাতিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ অরফানেজটি মূলত পরিত্যক্ত, আহত বা হারিয়ে যাওয়া হাতিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কেগাল্লা জেলার পিন্নাওয়ালা গ্রামে, মাওয়ানেলা ও ক্যান্ডির মাঝামাঝি অবস্থিত এ জায়গাটি আজ শ্রীলঙ্কার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। এখানে শুধু হাতি দেখাই যায় তা নয়–তাদের জীবনযাপন, যত্ন আর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পাওয়া যায়। পাঁচটি হাতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই অরফানেজে ২০২৫ সালে ছোট-বড় মিলিয়ে হাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮টি। অরফানেজটির ৫০ বছর পূর্তিতে এসব হাতি নিয়ে উদযাপন করা হয় ফল উৎসব।

কলম্বো থেকে লোকাল বাসে আবার ক্যান্ডি থেকে ক্যাব বা টুকটুক ভাড়া করে যেতে পারেন হাতির অরফানেজে। আমি গিয়েছিলাম ক্যান্ডি থেকে টুকটুক নিয়ে। অরফানেজের মূল রাস্তার মুখে নামার পর ১০-১৫ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিলেই আপনি পৌঁছে যাবেন অরফানেজে।

সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের অরফানেজে টিকিটের দাম ৩ হাজার ৫৭৫ শ্রীলঙ্কান রুপি। সেই অনুযায়ী টিকিট নিলাম। পরে বুঝতে পারলাম, এখানকার সৌন্দর্য দেখে পুরো টাকাই উসুল হয়ে যাবে পর্যটকদের। মাহাওয়ে নদীর তীরে ২৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই অরফানেজের ভেতরে পা দিয়ে একটু সামনে দিকে এগোলেই চোখে পড়বে হাতির দলের হেঁটে আসার দৃশ্য। একটু দূরে সবুজ পাহাড়। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। আগে এ জায়গা পুরোটাই উন্মুক্ত থাকলেও পর্যটক বেড়ে যাওয়ার পর হাতি এবং মানুষ উভয়কেই নিরাপদে রাখতে একটা নির্ধারিত মঞ্চের মতো জায়গায় রাখা হয়েছে। আপনি সেখান থেকেই দেখতে পাবেন হাতির খেলা এবং দলবেঁধে দুষ্টুমি করে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য। ঘর-পরিবার হারিয়ে এরা এখানে এসেই বানিয়ে নিয়েছে নিজেদের পরিবার ও বন্ধু। এদের দেখভালের জন্য আছে মাহুত। ছোট বাচ্চাদের ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়ানো থেকে হাতির সব ধরনের পরিচর্যা করে থাকেন এই মাহুতরা।

প্রতিটি হাতির রয়েছে আলাদা গল্প। কেউ বন থেকে হারিয়ে গেছে, কেউ আহত, কেউ বা শিকারির হাত থেকে উদ্ধার হয়েছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রে এদের সবকিছুই নিয়মমাফিক, নির্ধারিত সময়ে খাবার দেওয়া, বোতল ফিডিং করানো হয়। এদের প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা–দুই বেলা নিয়ে যাওয়া হয় অরফানেজের ঠিক উল্টো পাশের নদীতে গোসল করাতে। এই গোসলের দৃশ্য একদম কাছ থেকে দেখাকে কেন্দ্র করেই নদীর ঠিক পাশেই বেশ কিছু হোটেল গড়ে উঠেছে। অনেক পর্যটক থাকে এ হোটেলগুলোয়। তাই খালি পাওয়া যায় না হোটেলের রুম। অরফানেজে ঢোকার সময় শ্রীলঙ্কান রুপিতে যে টিকিট কিনেছিলাম তার মধ্যে গোসলের এই দৃশ্য দেখার এন্ট্রি ফিও অন্তর্ভুক্ত।
এই অরফানেজের আশপাশ ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু স্যুভেনির শপ, যেখানে আপনি অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক সুলভমূল্যে পেয়ে যাবেন নানা ধরনের স্যুভেনির। এখানেই রয়েছে হাতির মল থেকে প্রক্রিয়া করে কাগজ তৈরির বেশকিছু কারখানা। আপনি চাইলেই কর্তৃপক্ষ আপনাকে পুরো প্রক্রিয়া ঘুরে দেখাবে বিনামূল্যেই। হাতির মল থেকে তৈরি কাগজের ডায়েরি বা নানা সামগ্রী আপনি কিনতেও পারবেন এসব কারখানা থেকে।
অরফানেজের বাইরে নানা ধরনের দালালের দেখা মিলবে। তারা আপনাকে পাশে থাকা হাতির আশ্রয়কেন্দ্র বা চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে চাইবে, দামও হয়তো কমে মিলবে। কিন্তু সরকারি অরফানেজ রয়েছে এই একটি। বাকিগুলো মূলত কিছু হাতি এনে তাদের দিয়ে নানা ধরনের কার্যক্রম করায় পর্যটকদের জন্য। এতিম হাতিকে দেখতে হলে আপনাকে ঢুকতে হবে এই মূল আশ্রয়কেন্দ্রেই। এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও আপনি দেখতে পাবেন অরফানেজের মূল গেটে। শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে পাহাড়-সমুদ্র তো দেখবেনই, সঙ্গে হাতির এই অরফানেজে গেলে বাড়তি কিছু দেখার আনন্দ পাবেন। 

আরও পড়ুন

×