ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

বৃষ্টিস্নাত নীলের ছোঁয়া

বৃষ্টিস্নাত নীলের ছোঁয়া
×

বর্ষার সঙ্গে নীল রঙের সম্পর্ক গভীর মডেল: সোনিয়া রিফাত; পোশাক: রঙ বাংলাদেশ; মেকওভার: জারা’স বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

তপ্ত দিনের রুদ্ধশ্বাসের পর বর্ষা আসে প্রকৃতিকে শীতল করতে। ধুলোমাখা প্রকৃতিকে ধুয়েমুছে সজীব করে তোলে এ ঋতু।  কালো মেঘের আনাগোনা, টাপুর-টুপুর বৃষ্টি, কদম ফুলের সুবাস আর সবুজের সমারোহে চারপাশ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। প্রকৃতির এই রূপান্তর শুধু মনকেই আন্দোলিত করে না, ছাপ ফেলে মানুষের জীবনযাপন, সাজসজ্জা ও ফ্যাশনেও। পোশাকের রঙে বাড়ে নীলের প্রাধান্য, অলংকারে ধরা পড়ে প্রকৃতির ছোঁয়া, আর সাজে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধতা। লিখেছেন রিক্তা রিচি

‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে,/আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।।/এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে।।’– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
দূর আকাশে কালো মেঘের গর্জন শুনে হৃদয় আনন্দে নেচে ওঠে জানালার ধারে চেয়ে থাকা কোনো এক প্রেয়সীর। তার ইচ্ছে করে গ্রামছাড়া ওই কাদামাখা পথে হেঁটে বেড়াতে, মাঠের ধারে কদম ফুলের সুবাস নিতে। জানালার কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের রেখার মতো তারও কারও হৃদয়ের ঘরে নানা আঁকিবুঁকি করতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে নীল রঙে নিজেকে রাঙিয়ে অর্থাৎ মেঘনীল বেশে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। এমনটা হবেই না কেন? প্রকৃতিতে যে আষাঢ় এসেছে। বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ়ের শুরু মানেই তো প্রেম ও বিরহের উপচে পড়া। আষাঢ় শুধু প্রকৃতির রূপবদলের গল্পই বলে না, মানুষের জীবনযাপন, সাজপোশাক ও ফ্যাশনেও নিয়ে আসে নতুন মাত্রা।

প্রকৃতির রঙে রঙিন বর্ষা
গ্রীষ্মের তপ্ত দিনের অবসান ঘটিয়ে আষাঢ় যেন প্রকৃতিকে নতুন করে ধুয়েমুছে সাজিয়ে তোলে। দিনভর বর্ষণের পর ধুলোমাখা গাছপালা সবুজ হয়ে ওঠে, নদী-খাল-বিল ফিরে পায় প্রাণ। এতে মানুষের মনেও ফিরে আসে প্রশান্তি। সেই প্রশান্তির ছোঁয়া পড়ে পোশাক, অলংকার ও সাজসজ্জায়। এই সময় প্রকৃতির রঙের সমাহার বদলে যায়। প্রকৃতিতে সবুজের আধিক্য থাকে। তার সঙ্গে ধূসর মেঘ, কদম ফুলের সাদা-হলুদ, কৃষ্ণচূড়ার রং কিংবা শাপলার কোমল আভাও যুক্ত হয়। প্রকৃতির এই রংগুলোই বর্ষার ফ্যাশন ও অনুষঙ্গে স্থান পায়। 

বর্ষার রং নীল কেন? 
রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস জানান, বাংলার বর্ষার সঙ্গে নীলের সম্পর্ক খুবই গভীর। মেঘে ঢাকা আকাশ, দূর দিগন্ত, নদী-নালা ও বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির আবহ নীল রঙের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়। তাই নীলকে বর্ষার অন্যতম প্রধান রং হিসেবে ধরা হয়। তবে বর্ষা শুধু নীলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্ষার প্রকৃতিতে আমরা দেখতে পাই মেঘের ধূসর, কদম ফুলের সাদা-হলুদ, সজীব সবুজ, মাটির বাদামি, জলরাশির নীলাভ-সবুজ রং এবং সন্ধ্যার বেগুনি আভা। তাই বর্ষার রং আসলে অনেক বৈচিত্র্যময়, যা প্রকৃতির নানা রূপকে ধারণ করে।
অনেকেই মনে করেন বর্ষায় শুধু গাঢ় রং পরা উচিত। তবে ফ্যাশন ডিজাইনাররা মনে করেন, বর্ষা হলো রং নিয়ে খেলার সময়। নীলের পাশাপাশি সবুজের বিভিন্ন শেড, সাদা, কমলা, গোলাপি ও হলুদ ইত্যাদি রঙের সংমিশ্রণ বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় প্রাণবন্ত অনুভূতি এনে দেয়। বাদলা দিনে নেভি ব্লু, জলপাইয়ের বিভিন্ন শেডের পোশাক পরা যায়। এ ঋতুতে খুব বেশি আঁটোসাঁটো পোশাক না পরা ভালো। বরং ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত। এতে শরীরে আর্দ্রতা জমে না। ভিজলেও; যারা অফিসে যান এসির বাতাসে সহজেই শুকিয়ে যায়। এ ঋতুতে মেয়েরা ক্যাজুয়ালি ও ঘোরাঘুরির জন্য স্কার্ট, ডেনিম বা কটনের শর্টস, শর্ট কুর্তি, সিঙ্গেল কামিজ পরতে পারেন।

পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যই মূল কথা
বর্ষাকালের ফ্যাশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য। বৃষ্টির দিনে এমন পোশাক প্রয়োজন, যা দ্রুত শুকায় এবং চলাফেরায় স্বস্তি দেয়। এ সময় জর্জেট, সিল্ক, এন্ডি সিল্ক, সুতি, লিনেন কিংবা মিশ্র কাপড়ের পোশাক সবচেয়ে উপযোগী। ভারী সিল্ক, ভেলভেট বা অতিরিক্ত ঘেরওয়ালা পোশাক এড়িয়ে চলাই ভালো। নারীর জন্য কুর্তি ও পালাজ্জো, কটন বা জর্জেটের শাড়ি, হালকা কাজের কামিজ, মিডি ড্রেস, ফিউশন পোশাক বর্ষার দিনে আরামদায়ক হতে পারে। পুরুষরা কটন শার্ট, হাওয়াই শার্ট, লিনেন শার্ট, টি-শার্ট, চিনো প্যান্ট, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরতে পারেন। মোট কথা বৃষ্টির দিনে কাদামাখা পথে চলতে যেন খুব একটা বেগ পোহাতে না হয়, সেই প্রস্তুতি নিয়ে বাইরে বের হতে হবে। তাই তো বিভিন্ন ব্র্যান্ড এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বর্ষার পোশাকের সংগ্রহ সাজায়। 
সৌমিক দাস বলেন, ‘রঙ বাংলাদেশের বর্ষা কালেকশনে আমরা সবসময়ই বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঋতুবৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমাদের নকশায় বর্ষার মেঘ, বৃষ্টিধারা, নদীর ঢেউ, কদম ফুল, শাপলা, পল্লি-প্রকৃতির সবুজ আবহ এবং অনেক সময় বাংলার লোকশিল্পের বিভিন্ন অনুষঙ্গ প্রাধান্য পায়।’ 
তিনি বলেন, ‘মোটিফ ও নকশায় কখনও দেখা যায় জলরেখার প্রবাহ, কখনও বৃষ্টির ছন্দ, আবার কখনও বর্ষায় সজীব হয়ে ওঠা প্রকৃতির রূপ। রং, প্রিন্ট ও কারুকাজের সমন্বয়ে আমরা এমন পোশাক তৈরির চেষ্টা করি, যা একদিকে ঋতুর আবহকে ধারণ করে, অন্যদিকে সমসাময়িক ফ্যাশন ও ব্যবহারিক আরামকেও গুরুত্ব দেয়।’

শাড়িতে বৈচিত্র্যময় মোটিফ 
এ ঋতুতে একরঙা নীল শাড়ির পাশাপাশি সাদা জমিনে নীল পাড়, সবুজ, হলুদ কিংবা মেঘ-বর্ষা মোটিফের শাড়ি বেশি চলে। তাঁত, খাদি কিংবা হ্যান্ডপেইন্ট শাড়িতে বৃষ্টি, মেঘ, কদম ফুল, নৌকা বা শাপলার নকশা বর্ষার আবহকে আরও জীবন্ত করে তোলে। হরীতকীসহ বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর কালজয়ী কোনো চিত্রও ফুটিয়ে তোলে শাড়িতে।  

অলংকারে প্রকৃতির ছোঁয়া
আষাঢ়ের সাজে ভারী গহনার পরিবর্তে হালকা অলংকারই বেশি মানানসই। কাঠ, অক্সিডাইজড জুয়েলারি, কদম ফুলের গহনা, মুক্তার ছোট সেট সাজে এনে দিতে পারে ভিন্ন মাত্রা। চুলে একটি কদম ফুল কিংবা ছোট্ট ফুলের খোঁপা পুরো লুককে করে তুলতে পারে অনন্য।

কোথায় পাবেন বর্ষার পোশাক
দেশীয় বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে বর্ষা-অনুপ্রাণিত পোশাক। নারী, পুরুষ, শিশু–সবার জন্য রয়েছে বিশেষ সংগ্রহ। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার পরিবারের সদস্যদের জন্য মেঘ, বৃষ্টি কিংবা কদমফুলের মোটিফে কাস্টমাইজড পোশাকও তৈরি করে দেয়।

সাজ যেমন হবে 
জারা’স বিউটি লাউঞ্জের স্বত্বাধিকারী ফারহানা রুমি জানান, বর্ষার দিনে ভারী মেকআপ এড়িয়ে চলাই ভালো। মেকআপের শুরুতে ভালো মানের প্রাইমার ব্যবহার করুন। তারপর সানস্ক্রিন হালকা বিবি ক্রিম বা টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন। এবার ওয়াটারপ্রুফ পাউডার দিয়ে সেট করে নিন। ওয়াটারপ্রুফ আইলাইনার, কাজল ও মাসকারা ব্যবহার করলে বৃষ্টির পানিতে মেকআপ নষ্ট হওয়ার ভয় কম থাকে। ব্লাশ ও লিপস্টিকে পিচ, কোরাল, পিংক বা ন্যুড শেড মুখে এনে দেয় স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত লুক। তবে মেকআপের আগে ত্বককে প্রস্তুত করে নিতে হবে। এ জন্য মাইল্ড স্ক্রাবার দিয়ে স্ক্রাব করে মৃতকোষ তুলে নিতে হবে।
বর্ষায় চুল সহজেই রুক্ষ হয়ে যায়। তাই চুল খোলা রাখার পরিবর্তে এ সময় পনিটেইল, বান বা ব্রেইড স্টাইল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ফারহানা রুমি। এতে চুল কম জট বাঁধবে এবং পরিচ্ছন্ন দেখাবে। 

আরও পড়ুন

×