যোগে মুক্তি
শরীর ও মন সুস্থ রাখতে যোগব্যায়াম খুবই কার্যকর
রোজি আরেফীন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান ব্যস্ত সময়ে মানসিক চাপ যেন আমাদের প্রত্যেকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অফিসের কাজের চাপ, ব্যবসার অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা নিজের স্বপ্নপূরণে ব্যর্থতার ভয়–সব মিলিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে বসবাস করছে। প্রযুক্তির এই যুগে অফিস শেষে কাজের চাপও শেষ হয় না। ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক মাধ্যম আমাদের মস্তিষ্ককে প্রায় সবসময়ই ব্যস্ত রাখে। এর কারণে উদ্বেগ, অনিদ্রা, খিটখিটে মেজাজ এবং ক্লান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে শরীর ও মনকে একসঙ্গে সুস্থ রাখার একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠেছে ইয়োগা বা যোগব্যায়াম।
হাজার বছরের পুরোনো এই অনুশীলন শুধু শরীরচর্চা নয়, বরং শরীর, মন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের সমন্বিত একটি জীবনধারা। নিয়মিত ইয়োগা করলে শরীর নমনীয় হয়, পেশি শক্তিশালী হয় এবং মন শান্ত থাকে। বিশেষ করে মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যখন চাপের মধ্যে থাকি, তখন শরীর ও মস্তিষ্ক সবসময় এক ধরনের সতর্ক অবস্থায় থাকে। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, পেশিতে টান পড়ে এবং মনোযোগ কমে যায়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে উদ্বেগ, হতাশা ও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইয়োগার ধীর ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ধ্যান ও মনোসংযোগের চর্চা মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির থাকতে শেখায়। ফলে চাপের পরিস্থিতি থাকলেও তা মোকাবিলার মানসিক সক্ষমতা বেড়ে যায়।
মানসিক চাপ কমানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ইয়োগা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এর মধ্যে প্রাণায়াম যেমন অনুলোম-বিলোম, ভ্রমরী ও কপালভাতি শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ধ্যান বা মেডিটেশন নিয়মিত করলে মনোযোগ বাড়ে এবং মানসিক স্থিরতা তৈরি হয়। শরীরের টান ও ক্লান্তি দূর করতে তাড়াসন, বৃক্ষাসন ও মার্জারাসনের তো হালকা স্ট্রেচিং আসন উপকারী। এ ছাড়া শিশুসন শরীর ও মনকে গভীরভাবে রিল্যাক্স করে আর শবাসন অনুশীলনের শেষে সম্পূর্ণ মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। নিয়মিত এ সহজ অনুশীলনগুলো করলে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ কমে আসে এবং মন বেশি শান্ত ও স্থির থাকে।
দেশে-বিদেশে ইয়োগার জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে উৎপত্তি হলেও বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ বিশ্বের বহু দেশে এটি নিয়মিত স্বাস্থ্যচর্চার অংশ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক সুস্থতা বাড়াতে ইয়োগা সেশনের আয়োজন করে। প্রতিবছর ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে ইয়োগার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বসুন্ধরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইয়োগা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে ইয়োগা শেখার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত মাসিক কোর্সের খরচ চার থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে হলেও অনলাইনে অনেক প্রাথমিক কোর্স বিনা খরচে শেখা যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের সব চাপ দূর করা সম্ভব নয়। তবে সেগুলো মোকাবিলার দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। ইয়োগা সেই দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ আরও শান্ত, মনোযোগী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। তাই ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট সময় নিজের জন্য বের করে ইয়োগা চর্চা করা হতে পারে সুস্থ শরীর ও প্রশান্ত মনের একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পথ।
আপনি পুরুষ বা নারী যাই হোন না কেন, ঘরে বাইরের সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পরেও নিজের জন্য ব্যয় করা এই কয়েক মিনিট আপনাকে শুধু মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে তা নয়, বরং আপনাকে আরও ম্যাচিউরড এবং আরও সহনশীল হতেও অনেক সাহায্য করবে।
মানসিক চাপ কমাতে কিছু সহজ ইয়োগা টিপস
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অন্তত ২০ মিনিট ইয়োগা করার চেষ্টা করুন।
অনুশীলনের শুরু ও শেষে ৩-৫ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চা করুন।
নতুন হলে সহজ আসন যেমন তাড়াসন, বৃক্ষাসন বা শিশুসনে অভ্যস্ত হন।
ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট ধ্যান বা মেডিটেশন করলে মন শান্ত থাকে এবং ঘুম ভালো হয়।
ইয়োগা করার সময় মোবাইল ফোন ও অন্যান্য বিভ্রান্তিকর বিষয় থেকে দূরে থাকুন।
কোনো শারীরিক সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ইয়োগা শুরু করুন।
তথ্যসূত্র: জনস হপকিন্স মেডিসিন, ওয়েবএমডি
- বিষয় :
- যোগ ব্যায়াম
