বই যখন সঙ্গী
নিয়মিত বই পড়া মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে
স্মৃতি চক্রবর্তী
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মিরপুরের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি একসময় গল্পের বইয়ের নিয়মিত পাঠক ছিল। স্কুলের গ্রন্থাগার থেকে বই এনে পড়া ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন গেমের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকায় বইয়ের সঙ্গে তার তৈরি হয় দূরত্ব। দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহারের ফলে বই পড়ার অভ্যাস প্রায় হারিয়েই ফেলেছিল সে।
পরিস্থিতি বদলাতে উদ্যোগ নেয় তার পরিবার। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল ব্যবহার সীমিত করা হয় এবং রাতে অন্তত আধা ঘণ্টা বই পড়ার নিয়ম চালু করা হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই রাফি আবার বইয়ের জগতে ফিরে আসে। বর্তমানে সে মাসে অন্তত দুটি বই পড়ে।
রাফির মতো অনেক শিশু-কিশোরই আজ প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের কারণে বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চট্টগ্রামের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানহাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। করোনাকালের পর থেকে তার অধিকাংশ অবসর সময় কেটেছে ভিডিও দেখা ও অনলাইন গেম খেলায়। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। পরে বিদ্যালয়ের পাঠচক্র কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে সে আবার বই পড়া শুরু করে। বর্তমানে সে নিয়মিত গ্রন্থাগারে যায় এবং সহপাঠীদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে শিশু-তরুণদের মনোযোগ বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনা খুবই জরুরি। কারণ বই শুধু জ্ঞানের উৎস নয়, এটি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও কল্পনাশক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
বই পড়ার গুরুত্ব
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বই পড়া কেবল পাঠ্যবিষয় জানায় না–এটি কল্পনাশক্তি বাড়ায়, অনুধাবন ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা শক্তিশালী করে। নিয়মিত বইপাঠ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্যেও বইয়ের উপকার আছে। একটি ভালো গল্প উদ্বেগ কমায়, মানসিক চাপ হালকা করে এবং আবেগীয় বোধ বাড়ায়। তাদের মধ্যে ভাষার দক্ষতাও বাড়ে। শিক্ষার্থীদের জন্য বই পড়া যেমন শিক্ষার পরিধি বাড়ায়, তেমনি কর্মজীবীদের জন্য এটি দক্ষতা ও জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, ডিজিটাল ডিভাইস অনিবার্য, কিন্তু বইয়ের বিকল্প নয়। বিদ্যালয়ভিত্তিক আনন্দপাঠ ও কার্যকর গ্রন্থাগার ব্যবস্থা তৈরিই হবে মূল সমাধান। লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘একটি জাতিকে চিন্তাশীল করে তুলতে বই অপরিহার্য। ছোটবেলা থেকেই গল্প, বিজ্ঞান ও ইতিহাসমূলক বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করানো দরকার।’
কী করা যেতে পারে
পরিবার থেকেই শুরু হোক: শিশুর মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় মা-বাবা যদি সন্তানকে গল্প পড়ে শোনান বা বই উপহার দেন, তাহলে তাদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। শিশুকে বই উপহার দিন। তাদের বই কিনতে গ্রন্থাগারে নিয়ে যান।
পাঠাগার ও পাঠচক্রের গুরুত্ব: বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পাঠাগারের বিকল্প নেই। একটি সুন্দর ও প্রাণবন্ত পাঠাগার মানুষকে বইয়ের কাছে টেনে আনতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন পাঠচক্র, বই আলোচনা ও সাহিত্য আড্ডাও পাঠকের মধ্যে নতুন বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠচক্র, বই আলোচনা ও বইপাঠ প্রতিযোগিতা চালু রাখলে শিশুরা বই পড়ায় আগ্রহ পাবে।
সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা: স্থানীয় বইমেলা, সাহিত্যসভা ও অনলাইন বই বিতর্ক উৎসাহিত করুন। শিশুবান্ধব গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করুন।
মানসিক প্রশান্তিরও উৎস: বই পড়ার অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বই পড়া মানসিক চাপ কমায় এবং মনকে শান্ত করে। একটি ভালো গল্প বা অনুপ্রেরণামূলক বই পাঠককে কিছু সময়ের জন্য হলেও বাস্তব জীবনের নানা ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে।
বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব: প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, কোনো সন্দেহ নেই। এর পাশাপাশি বইয়ের জন্যও সময় রাখা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার অভ্যাসও ধীরে ধীরে একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। শুধু ছোটরা নয়, বড়রাও ব্যস্ত জীবনের মধ্যে একটু সময় বের করে বই পড়ার অভ্যাস করুন। কারণ একটি ভালো বই কখনও শুধু পড়া হয় না, এটি মানুষের জীবন ও চিন্তাকে অনেকটা বদলে দেয়।
মডেল: সামিয়া নওশাবা; ছবি: রকিবুল ইসলাম
- বিষয় :
- বই
