সঙ্গী নার্সিসিস্ট হলে...
আচরণের মাধ্যমে সঙ্গী নার্সিসিস্ট কিনা তা প্রকাশ পায় মডেল: নোমান ও জেরিন ছবি: মঞ্জু আলম
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্পর্কের শুরুতে মিতার মনে হয়েছিল, সঙ্গী যেন তাঁর চাওয়া-পাওয়া, মতামত ও অনুভূতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। মিতার সবকিছুতে ভদ্রলোক এতটাই যত্নশীল ছিলেন যে মিনিটে মিনিটে ফোন এবং খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু সম্পর্কের কিছুদিন পর থেকেই মিতার সঙ্গীর আচরণ বদলাতে শুরু করল। ছোটোখাটো বিষয়েও ঝামেলা, মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, মিতার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, মিতার প্রতি অপমান ও অবহেলা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। একসময় মিতা বুঝতে পারল, এটি শুধু স্বাভাবিক দাম্পত্য কলহ নয়; বরং সঙ্গীর আচরণ নিয়ে তাঁকে নতুন করে ভাবতে হবে।
মিতার মতো এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অনেক নারী-পুরুষই যান। সম্পর্কের শুরুতে পাওয়া ভালোবাসা, গুরুত্ব ও যত্ন একসময় বদলে যেতে পারে অবহেলা, সমালোচনা বা নিয়ন্ত্রণে। তখন প্রশ্ন আসে, এটি কি সম্পর্কের স্বাভাবিক টানাপোড়েন নাকি সঙ্গীর মধ্যে নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে?
সঙ্গী নার্সিসিস্ট কিনা, বোঝার উপায়
প্রতিটি সম্পর্কেই মতের অমিল, রাগ, অভিমান বা ঝগড়া হতে পারে। তাই সঙ্গীর সঙ্গে ঝামেলা হলেই তাঁকে নার্সিসিস্ট বলা ঠিক নয়। আত্মবিশ্বাসী হওয়া, নিজের সাফল্য নিয়ে গর্ব করা কিংবা কখনও নিজের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া মানেই নার্সিসিস্ট হওয়া নয়। নার্সিসিস্টিক ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা; যা একটি নির্দিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার নির্ণয় পেশাদারের বিষয়।
তবে নিচের বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে দেখা গেলে আপনাদের সম্পর্কটি নিয়ে ভাবা দরকার। সবসময় নিজেকে ও নিজের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। নিজের ভুল স্বীকার না করে অন্যের ওপর দায় চাপানো। আপনার অনুভূতি, কষ্ট বা মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা এবং আপনার সিদ্ধান্তে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা। সমালোচনা সহ্য না করা, কিন্তু আপনাকে নিয়মিত সমালোচনা করা। আপনার সাফল্যকে ছোট করা বা আপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। আপনাকেই বারবার মানিয়ে নিতে বাধ্য করা এবং ধীরে ধীরে আপনার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেওয়া।
এসব আচরণের এক-দুটি থাকলেই কেউ নার্সিসিস্ট–এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। বরং কতদিন ধরে এবং কতটা নিয়মিত এসব আচরণ হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সম্পর্কের মধ্যে আপনি নিজের মতো থাকতে পারছেন কিনা, সেটি খেয়াল করুন।
মনে রাখবেন, ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ এক নয়। সঙ্গী আপনার খোঁজ নেবেন, যত্ন করবেন–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন, কেন ফোন ধরতে দেরি হলো এসব নিয়ে সবসময় জবাবদিহি করতে হলে বা নিজের যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলেই ঝামেলা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
সঙ্গী নার্সিসিস্ট হলে যা করতে পারেন
প্রথমেই তাঁকে বদলে ফেলার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেবেন না। আপনার সঙ্গীর পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন তিনিও নিজের আচরণে সমস্যা আছে বলে স্বীকার করেন এবং নিজে বদলানোর চেষ্টা করেন। তাই নিজের সীমারেখা পরিষ্কার করুন। কোনো আচরণ মেনে নেবেন না, তা স্পষ্ট করুন।
নিজের পরিবার ও কাছের মানুষদের থেকে দূরে সরে যাবেন না। নিজের কাছের মানুষ, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। নিজের আর্থিক বিষয়গুলোও যতটা সম্ভব নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
সম্পর্ক থেকে কখন বের হয়ে যাবেন?
এ সিদ্ধান্ত সবার জন্য এক নয়। বিশেষ করে আমাদের দেশে বিয়ের সঙ্গে সন্তান, পরিবার, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও সামাজিক বাস্তবতাও জড়িয়ে থাকে। তাই সঙ্গী নার্সিসিস্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক ছেড়ে আসার পরামর্শ সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। বরং দেখুন, আপনার সঙ্গী নিজের ভুল স্বীকার করেন কিনা? নিজেদের মধ্যে সমস্যা হলে তা সমাধানের চেষ্টা করেন কিনা? যদি সঙ্গীর নিজেকে পরিবর্তনের ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকে, তাহলে আপনাদের সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। বছরের পর বছর একই আচরণ চলতে থাকলে এবং প্রতিবার শুধু আপনাকেই মানিয়ে নিতে হলে সম্পর্কটি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে।
তবে নিয়মিত অপমান, ভয় দেখানো, হুমকি, শারীরিক নির্যাতন, জোর করে যৌন সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা পরিবার-বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো আচরণ থাকলে বিষয়টি শুধু নার্সিসিজম হিসেবে দেখবেন না। এগুলো নির্যাতনের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সবার আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। সঙ্গী নার্সিসিস্ট কিনা, সেটি জানার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এ সম্পর্কটি আপনার জন্য কেমন। একটা সুস্থ সম্পর্কে মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু একজনের কথা বলার অধিকার আর অন্যজনের শুধু মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকতে পারে না।
সঙ্গীর ভালোবাসা যদি আপনাকে নিরাপদ করে, সম্মান দেয় এবং নিজের মতো থাকতে দেয়, সেটিই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ। ভালোবাসার নামে যদি আপনার স্বাধীনতা, আত্মসম্মান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়, তাহলে নিজেকেই প্রশ্ন করুন–আমি কি সত্যিই ভালোবাসার সম্পর্কে আছি, নাকি ভালোবাসার নাম করে আমার ওপর আরেকজনের ভয়াবহ নিয়ন্ত্রণ মেনে নিচ্ছি? v
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে
- বিষয় :
- আচরণ বিধিমালা