ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শরতের পোশাকে

শরতের পোশাকে
×

শরতের পোশাকে ছোট শিল্পকর্ম, প্রিন্ট কিংবা সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারির ব্যবহার বেশি চলছে

আসমাউল হুসনা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরতে রোদ-বৃষ্টির খেলা চলে। তাই বেশির ভাগ সময় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়। এমন আবহাওয়ায় পোশাকে আরামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এ ঋতুতে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সাদা, নীল ও অন্যান্য হালকা রং, ফুলেল মোটিফ ও সাধারণ নকশার বসন এনেছে। পোশাকের কাটছাঁট, গলা ও হাতার নকশা ও প্যাটার্নে রয়েছে নতুনত্ব। লিখেছেন আসমাউল হুসনা

প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে। নীল আকাশে তুলার মতো সাদা মেঘ যেন বারবার সে কথাটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঝলমলে রোদের পাশাপাশি হালকা বাতাস অনেকটা স্বস্তি দিলেও, বাইরে বেশ গরম অনুভূত হয়। এ ঋতুতে কড়া রোদে অফিস-বিশ্ববিদ্যালয়-ক্লাসে গেলে প্রথমেই পরিধেয় পোশাকটির কথা ভাবতে হয়। রোদে রাস্তায় হাঁটা কিংবা গণপরিবহনে যাতায়াত করলে সব ধরনের পোশাক স্বস্তি দেয় না। আবার আকাশ কালো হয়ে হুটহাট বৃষ্টির দেখাও মেলে শরতে। তাই পোশাক নির্বাচনে রোদ-বৃষ্টির কথা ভাবতে হবে। শরতের কোমল আবহে ফ্যাশনেও দেখা যাচ্ছে সাদা-নীলের প্রাধান্য, হালকা রং, ফুলেল মোটিফ বা শিল্পকর্ম ও স্বস্তিদায়ক নকশা।

এবারের শরতের পোশাকেও প্রকৃতির কোমল ও প্রশান্ত আবহকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো। কাশফুল, মেঘ, পাখি ও শরতের নানা অনুষঙ্গ উঠে আসছে শিল্পকর্মে বা নকশায়। তবে শুধু মোটিফে নয়, পোশাকের কাটিং, গলার নকশা, হাতা এবং বিভিন্ন অংশের ছোটখাটো ডিটেইলিংয়েও থাকছে নতুনত্ব। ভারী কারুকাজের পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন নকশা ও আরামদায়ক সিলুয়েটের দিকে ঝুঁকছেন ডিজাইনাররা।
দেশের ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘রঙ বাংলাদেশ’ও তাদের শরৎ আয়োজন সাজিয়েছে প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতার অনুপ্রেরণায়। এবারের সংগ্রহে কাশফুল বিশেষ গুরুত্ব পেলেও এর সঙ্গে মেঘ, পাখি ও শরতের প্রকৃতি থেকে নেওয়া নানা মোটিফ যুক্ত হয়েছে। নকশাগুলো রাখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে মিনিমাল; যাতে পোশাক উৎসবের পাশাপাশি প্রতিদিনও ব্যবহার করা যায়। রঙ বাংলাদেশের কর্ণধার সৌমিক দাস বলেন, ‘বাংলার প্রকৃতি ও ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য সবসময়ই আমাদের নকশার অন্যতম অনুপ্রেরণা। শরতের সঙ্গে কাশফুলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এবারের সংগ্রহে কাশফুলের শুভ্রতা, কোমলতা ও দুলতে থাকা ছন্দকে আধুনিক ও মিনিমাল ডিজাইনের মাধ্যমে তুলে ধরেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন পোশাক তৈরি করা, যা দেখতে নান্দনিক হওয়ার পাশাপাশি আরামদায়ক এবং উৎসব ও দৈনন্দিন দুই ধরনের আয়োজনেই পরিধানযোগ্য।’ 

কোমল রঙে শরতের আবহ
শরতের পোশাকে রঙের ব্যবহারেও এসেছে কোমলতার ছাপ। ব্লু, স্কাই ব্লু, অফ-হোয়াইট, সাদা, সফট বেইজ, ডাস্টি প্যাস্টেল, মিউটেড গ্রিন ও বিভিন্ন আর্থি টোন এবার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এসব রং চোখে আরাম দেয় এবং শরতের শান্ত আবহের সঙ্গেও সহজে মিশে যায়।
অফ-হোয়াইট ও স্কাই ব্লুর সমন্বয় কাশফুল ও নীল আকাশের অনুভূতি তৈরি করে। আবার বেইজ, মাটির কাছাকাছি টোন কিংবা মিউটেড গ্রিন পোশাকে এনে দেয় একটু ভিন্নমাত্রা। এর পাশাপাশি কিছু কনট্রাস্ট রং ব্যবহার করা হচ্ছে; তবে উজ্জ্বলতার আধিক্য না রেখে সামগ্রিক রঙের ভারসাম্য বজায় রাখাই মূল ভাবনা।

কাটিংয়ে স্বস্তি ও বহুমুখিতা
গত বছরের তুলনায় শরতের পোশাককে আরও ক্যাজুয়াল, আরামদায়ক ও বহুমুখী করার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। স্ট্রেইট কাট, সামান্য ফ্লেয়ার, রিলাক্সড সিলুয়েট কিংবা ঢিলেঢালা কুর্তি কাটিং শরতের আবহাওয়ার জন্য যেমন আরামদায়ক, তেমনি দেখতে আধুনিক। পোশাকের বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট ডিটেইলিং যুক্ত করে সাধারণ কাটেও বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে।

গলায় নতুন নকশা
রাউন্ড ও ভি-নেক বরাবরের মতোই জনপ্রিয়। তবে এবার পরিচিত কাটিংয়ের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সফট ভি-নেক, বোট নেক ও স্কয়ারিশ নেকের পাশাপাশি রাউন্ড নেকের সঙ্গে ছোট স্লিট বা প্ল্যাকেট ডিটেইল ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেকলাইনে ভারী এমব্রয়ডারি বা অতিরিক্ত অলংকরণের বদলে পরিষ্কার কাট এবং সূক্ষ্ম ডিটেইলিংকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গলার কাছে ছোট মোটিফ, সরু বর্ডার, কনট্রাস্ট পাইপিং কিংবা প্ল্যাকেটের ব্যবহার পোশাককে সহজ অথচ আলাদা করে তুলতে পারে।

হাতায় থাকছে বৈচিত্র্য
শরতের পোশাকে হাতার নকশায় এবার বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ থ্রি-কোয়ার্টার বা ফুল স্লিভের পাশাপাশি রিলাক্সড স্লিভ, সামান্য ফ্লেয়ার, কাফ ডিটেইল ও স্লিটযুক্ত হাতা জায়গা করে নিচ্ছে। হাতার প্রান্তে কনট্রাস্ট রং, ছোট নকশা, প্রিন্ট কিংবা সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও হাতার শেষাংশ একটু প্রশস্ত, কোথাও কাফের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে গঠন। তবে এখানেও ভারী কাজের বদলে পরিমিত নকশার দিকেই ঝোঁক বেশি। এতে হাতার সৌন্দর্য বজায় থাকে, আবার পোশাকটিও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী থাকে।

প্যান্টে রিলাক্সড ফিট
শরতের পোশাকে প্যান্টের ক্ষেত্রেও আরামের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। খুব টাইট ফিটের পরিবর্তে স্ট্রেইট কাট, রিলাক্সড ফিট, ওয়াইড বা সেমি-ওয়াইড লেগের প্যান্ট বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কুর্তি বা কামিজের সঙ্গে ওয়াইড বা সেমি-ওয়াইড লেগের প্যান্ট ব্যবহার করলে বেশ মানায়। একই প্রিন্টের টপ ও প্যান্টে তৈরি করা হয়েছে কর্ড সেট, আবার একরঙা কামিজের সঙ্গে প্রিন্টেড বা কনট্রাস্ট প্যান্টেও আনা হয়েছে বৈচিত্র্য। 

ফেব্রিকে আরাম
বাংলাদেশের শরৎকালেও গরম ও আর্দ্রতা থাকে। ফলে পোশাকের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ফেব্রিক নির্বাচনে আরামকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। হালকা, বাতাস চলাচল করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পরলেও স্বস্তিদায়ক এমন কাপড় এ সময় বেশি উপযোগী। 
কটন ও কটনবেজড আরামদায়ক ফেব্রিক শরতের জন্য ভালো পছন্দ। এসব কাপড়ে তৈরি পোশাক দৈনন্দিন ব্যবহারেও সহজ। বিশেষ করে মিনিমাল প্রিন্ট ও হালকা কাজের সঙ্গে আরামদায়ক ফেব্রিকের সমন্বয় শরতের পোশাকে তৈরি করে স্বাভাবিক সৌন্দর্য।

শাড়ি-পাঞ্জাবি থেকে ফ্রক
শরতের আয়োজন শুধু কুর্তি বা সালোয়ার-কামিজে সীমাবদ্ধ নেই। শাড়ি, পাঞ্জাবি, সিঙ্গেল কামিজ, টপস, শার্ট, ফ্রকসহ নানা ধরনের পোশাকেই ঋতুর রং ও মোটিফ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে একই রং বা মোটিফের পোশাকে ম্যাচিংয়ের সুযোগ থাকছে। শাড়িতে সাদা-নীল কিংবা অফ-হোয়াইটের সঙ্গে গাঢ় নীলের ব্যবহার উৎসবের আবহ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে হালকা প্রিন্টের কামিজ বা টপস অফিস ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সহজেই মানিয়ে যায়।

সাজ হোক হালকা
শরতের হালকা কাজ, ঢিলেঢালা পোশাকের সঙ্গে সাজও খুব ভারী না রাখাই ভালো। দিনের বেলায় হালকা বেস, ন্যুড বা সফট পিচ টোনের ব্লাশ এবং স্বাভাবিক রঙের লিপস্টিক যথেষ্ট। চোখে পাতলা কাজল বা আইলাইনার দিয়ে সাজ সম্পূর্ণ করা যায়। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ছোট টিপও যোগ করা যেতে পারে। চুলে খোলা সোজা বা হালকা ওয়েভ, নিচু পনিটেইল কিংবা সাধারণ বেণি মানিয়ে যাবে দৈনন্দিন পোশাকে। শাড়ি বা বিশেষ আয়োজনের পোশাক হলে নিচু খোঁপা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত সাজসজ্জার বদলে স্বাভাবিক চুলের স্টাইলই শরতের পোশাকের মিনিমাল ভাবকে ধরে রাখবে।

গহনা 
গহনাতেও সরলতা বেশি মানানসই। ছোট ঝুমকা, স্টাড, পাতলা চেইন, ছোট পেনডেন্ট কিংবা সরু চুড়ি দিয়ে সাজ সম্পূর্ণ করা যায়। শাড়ির সঙ্গে একটু বড় দুল বা ঝুমকা বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে পোশাকে যদি প্রিন্ট বা ডিটেইলিং বেশি থাকে, গহনা হালকা রাখাই ভালো। 
মডেল: ইপ্সিতা; মেকওভার: শোভন’স মেকওভার; পোশাক: রঙ বাংলাদেশ 
ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

আরও পড়ুন

×