পূজায় কোন পোশাকে কেমন সাজ
দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে। দুর্গাপূজার আর মাত্র কটা দিন বাকি। চারদিকে উৎসবের রব রব সাজ। কেনাকাটা চলছে পুরোদমে। পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে এসেছে বাহারি রং ও নকশার পোশাক। নতুন গহনা
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে। দুর্গাপূজার আর মাত্র কটা দিন বাকি। চারদিকে উৎসবের রব রব সাজ। কেনাকাটা চলছে পুরোদমে। পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে এসেছে বাহারি রং ও নকশার পোশাক। নতুন গহনা ও অনুষঙ্গও থরে থরে সাজানো রয়েছে ফ্যাশন ও জুয়েলারি ব্র্যান্ডের তাকে তাকে। বাজারে শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, ওয়ান পিস, ফতুয়া ও টি-শার্টে বাহারি থিম ও নকশা চোখে পড়ছে। রাজত্ব করছে ফিউশনধর্মী পোশাক। উজ্জ্বল সব রং যেমন লাল, কমলা, হলুদ, মেরুন, ব্রিক রেড, কফি ইত্যাদির পাশাপাশি অনুজ্জ্বল রং যেমন সবুজ, কলাপাতা, লেমন, প্যাস্টেল ও হালকা বেগুনি রং গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের পূজার পোশাকে। রঙিন সব পোশাকের পেছনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য থিম। পোশাকের ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস বলেন, ‘আমাদের এবারের পূজার আয়োজনের মূল প্রেরণা নেপালি উড কার্ভিং বা নেপালের ঐতিহ্যবাহী কাঠখোদাই শিল্প। নেপালের কাঠখোদাইয়ের ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারুশিল্পীদের হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে। মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যের কাঠের কাজে ধরা পড়ে তাদের সূক্ষ্ম শিল্পবোধ। রেখা, অলংকরণ আর খোদাই এ শিল্পকে দিয়েছে নিজস্ব পরিচয়। সেই শিল্পভাষা থেকেই রঙ বাংলাদেশ খুঁজে নিয়েছে এবারের উৎসবের পোশাকের নকশা ভাবনা।’
তিনি জানান, কাঠের গায়ে ফুটে ওঠা কারুকাজকে কাপড়ের উপযোগী নকশায় প্রকাশ করাই এ সংগ্রহের বিশেষ আকর্ষণ। ঐতিহ্যবাহী অলংকরণের ছন্দ ও বিন্যাসকে রঙ বাংলাদেশের নিজস্ব নকশা ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে সাজানো হয়েছে পোশাকগুলো। রঙ বাংলাদেশের এবারের পোশাকে নেপালি কাঠখোদাইয়ের পাশাপাশি রয়েছে দুর্গাপূজার প্রতীক ও উৎসবের আবহ থেকে অনুপ্রাণিত নকশা।
টুয়েলভ ক্লদিংয়ের পূজার পোশাকে উঠে এসেছে দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী কোলাম ও শান্তিনিকেতনের আলপনার নকশা। সেই আল্পনায় রঙিন হয়েছে সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, ওয়ান পিসসহ নারী-পুরুষের বিভিন্ন পোশাক। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ ছাড়াও পূজার দিনগুলোয় পরতে পারেন অন্যান্য ফিউশনধর্মী পোশাক। লা রিভ নিয়ে এসেছে কাফতান কাট শ্রাগ, ক্লাসিক শ্রাগসহ টিউনিক, ট্রেন্ডি কো-অর্ড, স্কার্ট-টপ সেট, প্যাটার্নড ও স্ট্রেইট সালোয়ার-কামিজ এবং সিঙ্গেল কামিজ। টিউনিক সেকশনে পাওয়া যাবে শর্ট, মিড-লেংথ ও লং টিউনিক। নতুন ডিজাইনের শার্ট, টি-শার্ট, টপসও রয়েছে সংগ্রহে। পূজার বিভিন্ন পর্বকে মাথায় রেখে নানা বুননের শাড়ি যোগ হয়েছে লা রিভের সংগ্রহে। লা রিভের জ্যেষ্ঠ নকশাকার মারুফা শিল্পী জানান, উৎসবের জন্য মানানসই মসলিন, কাতান ও হাফসিল্ক শাড়ি করা হয়েছে। শাড়ি জুড়ে আছে এমব্রয়ডারি, প্যাচ ও কারচুপির কাজ। সকালের স্নিগ্ধ সময়ের জন্য থাকছে প্রিন্ট ও একরঙা সুতি শাড়ি।
মারুফা শিল্পী জানান, ব্যাম্বু কটন ও জ্যাকার্ডের এক্সক্লুসিভ ফেব্রিকে তৈরি হয়েছে লা রিভের পূজা-স্পেশাল পাঞ্জাবি। রয়েছে টুইন-ফিটেড, প্রিন্টেড কটন ও ভিসকস পাঞ্জাবি। মিলিয়ে পরার জন্য রয়েছে ওয়েস্ট কোট, ক্ল্যাসিক আলীগড়, প্রিমিয়াম প্যান্ট ও অ্যাঙ্কেল লেংথ পায়জামা। ক্যাজুয়ালি পরার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে প্রিমিয়াম ফেব্রিকের ট্রেন্ডি শার্ট, টি-শার্ট ও পোলো শার্ট।
মোটিফ ও অলংকরণে নতুন-পুরোনোর মিশেল
লা রিভ, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্র্যাফটসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাকে প্রাকৃতিক মোটিফ, জিওলজিক্যাল স্ট্রাইপ, মস গ্রিন টেক্সচার ও ফুলেল ছাপা পূজার পোশাকে উৎসবমুখর রূপ পেয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের সঙ্গে প্যাচওয়ার্ক, ট্যাসেল, ট্রাইবাল প্যাটার্ন ও সাংস্কৃতিক উপাদান যুক্ত হয়েছে। পোশাকে আভিজাত্য বাড়াতে কারচুপি, জরি-জারদৌসির কাজ করা হয়েছে। কোনো কোনো ব্র্যান্ড পোশাকভেদে স্লাব কটনে স্ক্রিন প্রিন্ট, ভিসকসে ডিজিটাল প্রিন্ট ও হ্যান্ডওয়ার্ক, আবার জয় সিল্কে স্ক্রিন প্রিন্ট, হ্যান্ডওয়ার্ক ও এমব্রয়ডারিকে গুরুত্ব দিয়েছে। সুতি, সিল্ক, হাফসিল্ক, মসলিন ফেব্রিকের ওপর বাহারি কারুকাজ পূজার পোশাকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে বৈকি।
কোন পোশাকে কেমন সাজ
কারুকাজ করা পোশাকের সঙ্গে সাজ মানানসই হওয়া চাই। তা অবশ্যই আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে। দিনের বেলা যেহেতু বেশ গরম থাকে, এ সময় সুতি, লিনেনের অফহোয়াইট, হালকা গোলাপি, হলুদ, পিচ কিংবা আকাশি রঙের যে কোনো পোশাক পরতে পারেন। ষষ্ঠীর দিন থেকে শাড়ি পরতে পারেন। তবে যারা শাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তারা লং কুর্তি, পালাজ্জো, সালোয়ার-কামিজ কিংবা ফ্লেয়ার্ড কুর্তি বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে ছোট ঝুমকা, চিকন চুড়ি আর হালকা মেকআপ মানিয়ে যাবে। চুল খোলা রাখতে পারেন অথবা করতে পারেন পরিপাটি খোঁপা। সাজে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে চুলে গুঁজে নিতে পারেন তাজা ফুল।
সপ্তমীর পোশাকে থাকতে পারে উজ্জ্বল রঙের উপস্থিতি। লাল, কমলা, গাঢ় গোলাপি, সবুজ কিংবা নীলের মতো রং বেছে নিতে পারেন। শাড়ির পাশাপাশি আনারকলি, লং গাউন, ঘেরওয়ালা সালোয়ার-কামিজ কিংবা ফিউশন পোশাকেও মানিয়ে যাবে পূজার সাজ। শাড়ি পরতে চাইলে জামদানি, কাতান, তাঁতের শাড়ি কিংবা নকশা করা সিল্ক শাড়ি বেছে নিন। ঐতিহ্যবাহী শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট ব্লাউজ পরলে সাজে আসবে নতুনত্ব। যেমন সবুজ শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ কিংবা গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে রুপালি কাজের ব্লাউজ। গহনার ক্ষেত্রে অক্সিডাইজড রুপা, ঝুমকা, চোকার, লম্বা হার কিংবা কয়েক গাছা চুড়ি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়া হয়, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি হয়। এদিন সাদা-লাল শাড়ি পরতে পারেন। সাদা শাড়িতে লাল পাড়, লাল ব্লাউজ, কপালে লাল টিপ আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক গলিয়ে নিন। লাল-সাদা ছাড়া অন্য যে কোনো পছন্দের রঙের শাড়িও বেছে নিতে পারেন। গহনা হিসেবে বেছে নিতে পারেন সোনালি রঙের কানের দুল, সীতাহার, চুড়ি কিংবা ঐতিহ্যবাহী নকশার গহনা। চোখে হালকা স্মোকি মেকআপ, গালে সামান্য ব্লাশ আর ঠোঁটে লাল বা মেরুন লিপস্টিক সাজকে করে তুলবে পরিপূর্ণ।
নবমীতে ভারী কাজের শাড়ি, কাতান, বেনারসি কিংবা জমকালো লেহেঙ্গা পরতে পারেন। গাঢ় লাল, মেরুন, বেগুনি, পান্না সবুজ কিংবা সোনালি রঙের পোশাক ভালো মানাবে। সিকুইন কাজের গাউন, এমব্রয়ডারি করা কো-অর্ড সেট কিংবা ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাকও হতে পারে সঙ্গী। লম্বা কানের দুল, স্টেটমেন্ট নেকলেস কিংবা আংটি দিয়ে সাজে যোগ করা যায় আলাদা মাত্রা। নবমীর সাজে চুলের স্টাইলেও রাখতে পারেন বৈচিত্র্য। ঢেউখেলানো খোলা চুল, সাইড বান কিংবা সুন্দর করে বাঁধা খোঁপা সবই মানিয়ে যাবে।
দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের আগে সিঁদুরখেলায় মেতে ওঠেন অনেক নারী। তাই এদিনের সাজে লাল-সাদার উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ, কপালে বড় টিপ আর সিঁথিতে সিঁদুর যেন এদিনের চেনা সাজ। যারা শাড়ির বাইরে অন্য পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তারা লাল-সাদার কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ কিংবা ফিউশন পোশাক পরতে পারেন। দশমীর সাজে মেকআপ রাখতে পারেন হালকা। তবে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক আর চোখে কাজল থাকলে সাজে বাঙালিয়ানা আসবে। কানের দুল, চুড়ি আর টিপেই সাজ পূর্ণ করুন।
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল