তিনি আমার অভিভাবক
আসলাম হোসাইন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
জীবনের গতিপথে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে, যাদের প্রথম দেখায় সহজে পাঠ করা যায় না। তাদের অনুধাবন করতে বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, আবার কখনও প্রয়োজন পড়ে কোনো এক নির্জন বিকেলে থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকানোর। স্মৃতিময় অতীতের চেনা দুয়ার খুললে হঠাৎ আবিষ্কার করা যায়–যে মানুষটিকে একদিন খুব ভয় পেতাম, নিঃশব্দে তিনি হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে রূপান্তরকারী অধ্যায়টি রচনা করে দিয়েছেন। আমার জীবনেও ঠিক তেমনই একজন অভিভাবক আছেন–সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ এমদাদুল হক স্যার।
উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার দিনগুলোয় স্যারকে কেন্দ্র করে বুকের ভেতর এক অনির্বচনীয় ভীতি কাজ করত। তাঁর গম্ভীর অবয়ব, সুদৃঢ় কণ্ঠ আর কঠোর অনুশাসন আমার কাঁচা বয়সের সরল মনে অহেতুক এক অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে রাখত। স্যারের ধারালো চোখ এড়াতে শ্রেণিকক্ষের পেছনের বেঞ্চে নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। কোনো কোনো দিন অকারণ ভয়ে ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার মতো দুঃসাহসও দেখাতাম। কেটে গেল দুটি বছর। ভেবেছিলাম, কলেজজীবনের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের এই মেঘও কেটে যাবে। নিয়তির সমীকরণ বড় অদ্ভুত! স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে পরিচিতিমূলক প্রথম ক্লাসে পা রাখতেই বুকের স্পন্দন যেন থেমে গেল–সামনে হাসিমুখে বসে আছেন সেই এমদাদুল হক স্যার! মনে হলো, এতদিন যে খাঁচাকে দূর থেকে ভয় পেয়েছি, জীবন আমাকে নিজের অজান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে সেই খাঁচার ঠিক মাঝখানে।
তবে দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বুঝেছি, ওটা কোনো ভয়াল খাঁচা ছিল না; ওটা ছিল জীবনকে নতুন করে চেনার সবচেয়ে পবিত্র পাঠশালা। সেই তথাকথিত ‘কঠিন’ মানুষটি ছিলেন এমন এক মহান কারিগর, যিনি কেবল সাহিত্যের পাঠ দেননি, বরং মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও আত্মমর্যাদা আবিষ্কারের দীক্ষা দিয়েছেন।
স্যারের গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরিসীম মমতার ছোঁয়া পেতে আমার কিছুটা সময় লেগেছিল। যে শাসনকে একদিন দূরত্ব মনে হয়েছিল, তার গভীরে ছিল অগাধ ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের সুর।
আজ অন্তরের গভীর থেকে অনুধাবন করি, স্যার আমার হাত ধরে প্রতিটি পথ পাড়ি দেননি, কিংবা আমার জীবনের অন্ধকার সরানোর দায় নেননি। তিনি কেবল আমার হৃদয়ের গহিনে এমন এক চিরন্তনী আলো জ্বেলে দিয়েছেন, যার সাহায্যে আজ আমি যে কোনো প্রতিকূলতায় নিজের পথ নিজে বেছে নিতে পারি।
সব গুরু হয়তো সূর্যের মতো উত্তপ্ত আলো ছড়িয়ে জীবনকে উদ্ভাসিত করেন না; কেউ কেউ রাতের জোনাকির মতো নীরবে পাশে রয়। জীবনের পথ যখন অমাবস্যার আঁধারে ঢেকে যায়, তখন তাদের সেই অমলিন বিশ্বাস ও অনুশাসনের ক্ষীণ আলো মানুষকে সঠিক গন্তব্যের সন্ধান দেয়। এমদাদুল হক স্যার আমার জীবনের তেমনই এক নীরব দীপশিখা–আমার অন্তরের পরম পথপ্রদর্শক।
সাধারণ সম্পাদক, সুহৃদ সমাবেশ, বগুড়া
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ