উচ্চারণের বিপরীতে
জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে আলোচনা চাই
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিতে সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনাতেই নেওয়া হয়। তার আগে আইনসভায় আলাপ-আলোচনা এবং পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্ক চলে; শেষে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই আকাঙ্ক্ষার অনুশীলন আমাদের দেশে কতখানি হচ্ছে? বিশেষত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপুঙ্খভাবে আলোচিত হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে সেটা ঘটছে না; এ নিয়ে কথা বলবার সময় এসেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবার আগে সাততাড়াতাড়ি চুক্তি স্বাক্ষর থেকে অনুমান করা যায়, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পক্ষপাতী ছিল না। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, নির্বাচিত হওয়ার সাত মাসেও সরকারি বা বিরোধী দলও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা করল না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদের আদ্যন্ত নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই বর্তমানে ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে চুক্তিটিতে বাংলাদেশ এখনও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ না পেলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, তারা এতে যোগ দিতে আগ্রহী। মক্কা চুক্তি সম্পর্কে যতদূর জানা যাচ্ছে, এটি ন্যাটোর মতো যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি; তিনটি রাষ্ট্রের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে। বস্তুত, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধে সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ব্যাপক হামলার প্রেক্ষিতেই সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মতো মার্কিন মিত্ররা এই বিকল্প বন্দোবস্তের পথে এগিয়েছে। ইতোমধ্যে ন্যাটোভুক্ত তুরস্ক ইসরায়েলের অব্যাহত হুমকির মুখে নতুন প্রতিরক্ষা বলয়ে যুক্ত হতে চাইছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কেন স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হতে চাইছে?
যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে– বর্তমানে মক্কা চুক্তিভুক্ত তুরস্ক বা সৌদ আরব প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। জোটে গেলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়বে। সৌদি আরবে আমাদের বিশাল শ্রমবাজারে বাড়তি সুবিধাও যোগ হবে। আরও বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বীপ রাষ্ট্রের মতো একাকী; এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় মক্কা চুক্তি জাতীয় নিরাপত্তায় সহায়ক হবে।
কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ তো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। একাত্তরের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান ভেঙে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী ৫৫ বছরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পরও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিসহ দেশের মূলনীতির কোনোটিই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে গড়ে ওঠেনি। বরং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের মাধ্যমে ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতিই অনুসৃত হয়েছে।
আরও বড় কথা, প্রথমবারের মতো কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এর ভালো-মন্দ সবকিছু প্রকাশ্যে আলোচনা জরুরি। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হতে হবে।
২.
ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র– এই তিন বড় শক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মাত্রা নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। বিশেষত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়েছেন, সেটাও সৎ প্রতিবেশীসুলভ নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত কার্ড’ যেমন, তেমনই ভারতের রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলা হয় উগ্রবাদী ভোটারদের তুষ্ট করতে। এ দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকরাও শুভেন্দু অধিকারীর ভাষাতেই কথা বলে থাকেন; রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার অপচেষ্টা করেন।
রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা সবসময়ই ক্ষতিকর ও বর্জনীয়। সে জন্য কোনো দেশকে শত্রু বানানো কোনো মীমাংসা হতে পারে না। একইভাবে সব দেশের সঙ্গেই সম্পূর্ণ নিজের স্বার্থ বিবেচনাতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গভীরভাবে জড়িত। পররাষ্ট্রনীতি ও ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে তাই সবপক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্ব বাস্তবতাও তাই; সব দেশ-ই নিজের স্বার্থ সবার আগে দেখে। নিজের স্বার্থেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় রাখতে হয়। যেমন, ইরান সংকটের সময় চীন প্রকারান্তরে ইরানকে সমর্থন করেছে। এর আগে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সমঝোতায়ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন বাস্তবতা দেখা দিয়েছে, সেটা সহজ নয়। সব পক্ষের অবস্থান বুঝেই বাংলাদেশকে ‘মক্কা চুক্তি’ বিষয়ে অবস্থান নিতে হবে।

৩.
আমাদের জাতীয় স্বার্থ, নাগরিকদের মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে অবস্থান কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো একজন কর্মকর্তার প্রেস কনফারেন্সে জানিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট হতে পারে না। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সংসদে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে। এর পক্ষে-বিপক্ষে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের যুক্তিতর্ক আমরা শুনতে চাই। সব দিক বিবেচনায় এনে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জাতিকে জানিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি কতখানি যুক্তিসংগত আলোচনা করতে সক্ষম, তার একটি পরীক্ষা হয়ে যেতে পারে সংসদে ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে আলোচনায়। অবশ্য ধর্মীয় আবেগে যদি বিরোধী দল ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা না করেই সম্মতি জানিয়ে দেয়, তাহলেও সেটা একটি মৌলিক প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
মনে আছে, দেশজুড়ে ‘তৌহিদী জনতা’ নাম দিয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই নানা অরাজকতা তৈরি এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক আয়োজনে বাধা দিয়ে আসছে। সম্প্রতি সাভারে একটি ওরস বন্ধের উদ্যোগেও বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে মজলিশের নেতাদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। স্পষ্টতই ‘তৌহিদী জনতা’ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে অরাজনৈতিক মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠেছে!
সরকারি দল বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপিসহ সব দলকে ‘তৌহিদী জনতা’ সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে হবে। আইনের শাসনে বিশ্বাসী হলে আইনবহির্ভূত সব ধরনের অরাজকতার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে।
আর জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো ইস্যুতে জাতীয় সংসদে খোলাখুলি আলোচনা হতে হবে। সংসদে ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়েও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান জাতির সামনে পরিষ্কার হতে হবে। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও বিলম্বে হলেও সংসদে আলোচনা হতে পারে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমাদের অবশ্যই উদারতা ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিতে হবে।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
- জাতীয় সংসদ
- আলোচনা