প্রিয় শিক্ষকের মুখ
শাসনের আবরণে পরম মমতা
হারুনর রশিদ
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার গ্রেডশিটে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের আসল পাঠ লুকিয়ে থাকে শিক্ষকদের আদর্শ, নীতি ও স্নেহের মায়াজালে। তাদের শাসন ও অনুশাসনের আড়ালে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আদর্শ ও আত্মসম্মান। পাঠ্যবইয়ের বাইরে সততা ও মানবিক মূল্যবোধে চরিত্র গঠনে শিক্ষকরা হলেন পথপ্রদর্শক ও আলোকবর্তিকা। প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে সুহৃদদের লেখায় আয়োজন–
তখন আমি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। স্কুলে যাওয়ার আনন্দের চেয়ে বুকচাপা ভয়টা যেন বেশি গ্রাস করত। নতুন বইয়ের গন্ধ, খাতার ধবধবে সাদা পাতা কিংবা টিফিনের সেই পরিচিত ঘণ্টা–সবই খুব প্রিয় ছিল। শুধু শ্রেণিকক্ষে পা রাখলে বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা তোলপাড় তুলত।
আমাদের শ্রেণিশিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় মোসলেম উদ্দিন খান স্যার। পরম শ্রদ্ধেয় এ মানুষটি আমার শিক্ষাজীবনের প্রথম অনুভূতির শিক্ষক। তবে তাঁর শাসন ছিল বেশ কড়া। হাতে থাকত সেই চিকন সপসপে বেত। পড়া না পারলে শাস্তির ভয় ছিল নিত্যসঙ্গী। তাই স্যারের ভয়ে পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র ফাঁকি দিতাম না।
একদিন প্রথম ঘণ্টার বেল বাজল। অথচ স্যার ক্লাসে এলেন না। পুরো শ্রেণিকক্ষে এক অস্বাভাবিক, ভারী নীরবতা নেমে এলো। যে ছেলেগুলো একটু আগেও চঞ্চলতায় মেতে ছিল, তারাও একদম চুপ। সবার চোখ বারবার দরজার ফাঁকে আটকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, স্যারের এই অনুপস্থিতি যেন কোনো এক অশুভ বিপদের সংকেত। কিছুক্ষণ পর খবর এলো–স্যার প্রচণ্ড অসুস্থ। খবরটি শোনামাত্র বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে মানুষটির কড়া শাসন আর বেতকে আমরা দিনরাত এত ভয় পেতাম, তিনি অসুস্থ–এ কথা যেন শিশুমনে কিছুতে সহ্য হচ্ছিল না। হঠাৎ আমাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, ‘চলো, সবাই মিলে স্যারের জন্য দোয়া করি।’
পলকে বদলে গেল দৃশ্যপট। আমরা সবাই মাথা নিচু করলাম। অবোধ শিশুমনের অতি সরল, নিষ্পাপ হাতগুলো আকাশের দিকে উঠে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা জল আর বুকভরা আকুতি নিয়ে আমরা স্যারের সুস্থতা কামনা করলাম। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম– শাসনের সেই কঠিন বর্মের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে এক সমুদ্র ভালোবাসা।
বছর ঘুরে চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলাম। এবার আমাদের সঙ্গী হলেন গণি স্যার। বয়সের ভারে তাঁর চলাফেরা ছিল খুবই ধীর; হাতে থাকত একটি কাঠের ডাঁটিওয়ালা ছাতা। ক্লাসে এসে তিনি ধীরপায়ে বোর্ডের সামনে দাঁড়াতেন। কখনও হাত কাঁপত, কখনও বা স্পষ্ট কণ্ঠে ভেসে উঠত বয়সের ক্লান্তি; কিন্তু পড়তে বসালেই তাঁর চোখে দেখা যেত এক অদ্ভুত, মায়াবী দীপ্তি।
একদিন তীব্র তাপদাহে ক্লাস চলছিল। রোদ এসে মেঝেতে যেন এক অলস ছায়া ফেলছিল; গরমে আমরা সবাই অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। অথচ গণি স্যার নিঃশব্দে কাঁপা হাতে বোর্ডে লিখে চলেছেন। হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন। আমাদের অস্থির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু মায়াবী হেসে বললেন, ‘তোমরা একদিন মস্ত বড় মানুষ হবে–এই আশাতে তো সব কষ্ট ভুলে প্রতিদিন স্কুলে আসি বাবা।’
কথাটি তখন অত গভীরভাবে বুঝিনি। আজ জীবনের মাঝদরিয়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি অক্ষরে তার অর্থ বুঝি। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় কত শিক্ষক এসেছেন, কত মুখ স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন কিন্তু মোসলেম উদ্দিন স্যারের সেই কঠোর চোখের ভেতরের ভালোবাসা আর গণি স্যারের প্রবীণ, কাঁপা হাতের স্পর্শ আজও আমার মানসপটে অমলিন।
আজও যখন কোনো ক্লান্ত শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে দেখি, স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে সেই মানুষগুলোর অবয়ব। তাঁরা হয়তো জাগতিক কোনো বড় পুরস্কার পাননি, তাদের নামে গড়ে ওঠেনি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ। পরম মমতায় নিজের রক্ত-ঘাম জল করে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য মানুষের জীবন।
তখন মনে হয়, একজন সত্যিকারের শিক্ষক কখনও ইতিহাস থেকে মুছে যান না। তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর ছাত্রের সততায়, আচরণে আর কর্মে। বেঁচে থাকেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়া অফুরন্ত আলোয়। তাই হৃদয়ের গভীর থেকে আজও নীরবে প্রার্থনা করি–স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন।
সভাপতি, সুহৃদ সমাবেশ, ফরিদপুর
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ