ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বইয়ের পাতার বাইরে জীবনের পাঠ

বইয়ের পাতার বাইরে জীবনের পাঠ
×

অলংকরণ :: শেখ শাহাদ

কাজী সুলতানুল আরেফিন

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্মৃতির ক্যানভাস থেকে কি কখনও মুছে ফেলা যায়? জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসেও মনে পড়ে তাদের কথা। মাঝেমধ্যে স্মৃতির পর্দা উন্মোচিত হলে নিজের অজান্তে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে; বুকে চেপে রাখা আবেগ অশ্রু হয়ে নেমে আসে।
আজ আমার দুই পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক–কাসেম স্যার আর খোদেজা ম্যাডামের কথা বলব। এটি কোনো কাল্পনিক কাহিনি নয়, আমার জীবনের একটি সত্য গল্প।
চট্টগ্রামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন কাসেম স্যার। আমাদের বাসার পাশে ছিল তাদের ঘর। যদিও আমি পড়তাম চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের কাছে অবস্থিত চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে। গণিত প্রাইভেট পড়ার সুবাদে কাসেম স্যারের ছায়াতলে আমার প্রথম যাওয়া।
স্যারের সহধর্মিণী খোদেজা আক্তারও ছিলেন একজন শিক্ষিকা। চট্টগ্রাম পূর্ব মাদারবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতেন। আমরা তাঁকে ভক্তিভরে ‘খোদেজা ম্যাডাম’ বলে ডাকতাম। তাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে সামিয়া ছিল আমার সহপাঠী। আমার মতো আরও অনেকে স্যারের কাছে গণিত শিখতে যেত। কেন জানি মনে হতো স্যার ও ম্যাডাম আমাকে একটু বেশি ভালোবাসতেন। কাসেম স্যার কেবল বইয়ের অঙ্ক শেখাতেন না; জীবনকে কীভাবে সততা ও নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করতে হয়, সেই মহান উপদেশগুলো প্রতিদিন নিখুঁতভাবে বুঝিয়ে দিতেন।
একদিন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আমার মন খুব ভার হয়ে ছিল। ম্যাডামের স্নেহাতুর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি বিষয়টি। প্রাইভেট পড়া শেষে সবাই যখন চলে গেল, তিনি আমাকে একটু বসতে বললেন। তারপর কাসেম স্যারকে ডেকে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি বোধহয় খেয়াল করেননি, আজকে আরেফিনের মন খুব খারাপ! সে নিশ্চয় বাসা থেকে কিছু না খেয়ে এসেছে।’
এরপর স্যার আর ম্যাডাম পরম মমতায় আমাকে প্রায় জোর করেই অনেক কিছু খাইয়ে দিলেন। এরপর থেকে যখনই আমার মন একটু বিষণ্ন দেখতেন, তারা একইভাবে কাছে টেনে নিতেন। বলতেন, ‘তোর কোনো কষ্ট বা সমস্যা থাকলে নিঃসংকোচে আমাদের বলবি।’ আমি শত চেষ্টা করেও তাদের বিশ্বাস করাতে পারতাম না যে আমি না খেয়ে নেই কিংবা আমার কোনো অভাব নেই। এভাবে পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি জীবনে কীভাবে মায়ামমতার সুদৃঢ় বন্ধনে মানুষকে জড়াতে হয়, সেই অমূল্য পাঠ পেয়েছিলাম তাদের কাছ থেকে। কেবল আমাদের নয়, দরিদ্র ও অসহায় প্রতিবেশীদের প্রতিও তাদের অগাধ করুণা ও সদয় আচরণ প্রত্যক্ষ করেছি।
জীবনের তাগিদে একসময় চট্টগ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে আসতে হয়। দীর্ঘদিন পর একদিন খবর পেলাম–খোদেজা ম্যাডাম মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। কাসেম স্যার আজও বেঁচে আছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে আজও হুটহাট মনটা ছুটে যেতে চায় সেই পুরোনো দিনগুলোয়; সেই অমলিন আশ্রয়ে। জীবনের দীর্ঘ সরণি বেয়ে এসেও তাদের কথা একদিনের জন্যও ভুলতে পারিনি।
পরবর্তী জীবনে আমিও কিছুকাল শিক্ষকতা করেছি, প্রাইভেট পড়িয়েছি। নিজের শিক্ষার্থীদের যখনই পড়াতে বসতাম, তাদের শেখানো আদর্শ মনে ফুটে উঠত। চেষ্টা করতাম কোনো ছাত্রের মন খারাপ কিনা তা অনুধাবন করতে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদয় আচরণ করার অভ্যাসটাও তাদের জীবন থেকে পাওয়া। তাদের কথা আজ খুব মনে পড়ে। কাসেম স্যার আর খোদেজা ম্যাডাম শুধু বিদ্যার আলোই ছড়াননি; ছড়িয়েছিলেন এক অমর মায়ামমতার দীপ্তি। 
সভাপতি, সুহৃদ সমাবেশ, ছাগলনাইয়া, ফেনী

আরও পড়ুন

×