ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রিয় শিক্ষকের মুখ

আমাদের বিশ্বনাথ স্যার

আমাদের বিশ্বনাথ স্যার
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

দীপান্বিতা পালিত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার গ্রেডশিটে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের আসল পাঠ লুকিয়ে থাকে শিক্ষকদের আদর্শ, নীতি ও স্নেহের মায়াজালে। তাদের শাসন ও অনুশাসনের আড়ালে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আদর্শ ও আত্মসম্মান। পাঠ্যবইয়ের বাইরে সততা ও মানবিক মূল্যবোধে চরিত্র গঠনে শিক্ষকরা হলেন পথপ্রদর্শক ও আলোকবর্তিকা। প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে সুহৃদদের লেখায় আয়োজন–

শৈশবের ক্যানভাসে এক দীপ্যমান নাম ছিল আমাদের বিশ্বনাথ স্যার। তিনি কেবল স্কুলে বাংলা সাহিত্যই পড়াতেন না; জীবনের পাতায় কীভাবে নীতি আর সততার কবিতা লিখতে হয়, তা নিজের আচরণ দিয়ে শিখিয়ে দিতেন।

বিশ্বনাথ স্যার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নীতিবান মানুষ। ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর হাতে একটি পুরোনো কাঠের ফ্রেমের চশমা–এই ছিল তাঁর চিরচেনা রূপ। তিনি প্রায়ই ক্লাসে বলতেন, ‘অসততার আলোয় আলোকিত হওয়ার চেয়ে সততার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। যে নিজেকে ঠকায় না, তাঁকে পৃথিবীর কোনো শক্তি হারাতে পারে না।’
স্যারের সেই কথার আসল রূপ দেখেছিলাম আমাদের স্কুলের বার্ষিক বিতর্ক প্রতিযোগিতার ফাইনালে। চূড়ান্ত পর্বে আমাদের দলের মুখোমুখি হয়েছিল পাশের নামজাদা এক স্কুল। ট্রফি জেতা আমাদের জন্য মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিতর্কের বিষয়ের ওপর কিছু বিরল তথ্য জোগাড় করার দায়িত্বে ছিলেন বিশ্বনাথ স্যার নিজে। ভুলবশত প্রতিযোগিতার আগের রাতে তাঁর তৈরি করা সেই গুরুত্বপূর্ণ নোটের খসড়াটি প্রতিপক্ষ স্কুলের দলনেতার হাতে পৌঁছে যায়।

আমরা যখন জানতে পারলাম, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম। সবাই স্যারকে অনুরোধ করলাম, বিষয়টি বিচারকদের জানিয়ে প্রতিপক্ষকে যেন বাতিল করে দেওয়া হয়। এতে খুব সহজে ট্রফিটা আমাদের হাতে চলে আসত। স্যার সেদিন মৃদু হেসে মাথা নেড়েছিলেন। শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলেছিলেন, ‘জিততে হলে নিজেদের যোগ্যতায় জিততে হবে, অন্যের দুর্ঘটনাজনিত ভুল বা শাস্তির সুযোগ নিয়ে নয়। ট্রফি ঘরে আনার চেয়ে সততা ধরে রাখা অনেক বেশি বড় জয়।’ স্যার সেদিন রাত জেগে আমাদের জন্য নতুন তথ্য ও যুক্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমরা সেদিন ট্রফি জিতেছিলাম। স্যার আমাদের শুধু বিজয়ী করেননি; শিখিয়েছিলেন প্রকৃত আত্মসম্মান কাকে বলে।

জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকে আমি নিজেও একজন শিক্ষক। প্রতিদিন যখন শ্রেণিকক্ষে ঢুকি, শিক্ষার্থীদের সামনে চক-ডাস্টার নিয়ে দাঁড়াই, তখন বুকের গভীরে অসীম শ্রদ্ধার দোলাচল জাগে। মনে পড়ে যায় নিজের ছাত্রজীবনের কথা। শিক্ষকরা যখন ছোটখাটো ভুলের জন্য কড়া চোখে তাকাতেন বা বকুনি দিতেন, তখন মনে মনে খুব রাগ হতো। ভাবতাম, তারা বুঝি অকারণে কড়া নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছেন। আজ শিক্ষকতার চেয়ারে বসে, দায়বদ্ধতার ভার কাঁধে নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে হৃদয় দিয়ে বুঝি–সেই শাসনের আড়ালে কোনো ব্যক্তিআক্রোশ ছিল না; ছিল এক বুক খাঁটি ভালোবাসা আর আমাদের সুন্দর ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ। কাঁচা মাটি দিয়ে যেমন সুন্দর প্রতিমা গড়া হয়, তেমনি আঘাত ও শাসনের ছাঁচে গড়ে ওঠে একজন মানুষের চরিত্র। বিশ্বনাথ স্যারের মতো পথপ্রদর্শককে জানাই চিরন্তন শ্রদ্ধা। স্যার, আপনি সততা ও নীতির যে মশাল আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই আলো যেন আমার শিক্ষার্থীদের হৃদয়েও আজীবন জ্বালিয়ে রাখতে পারি। 
 সুহৃদ, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন

×