ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

জেন্ডার বাজেট

কিছু প্রশ্ন ও ভাবনা

কিছু প্রশ্ন ও ভাবনা
×

.

শামিমা আক্তার

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪ | ১১:০৬ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৪ | ১২:৪৭

একুশ শতকের শুরুর দিকে যখন কর্মজীবন শুরু করি, তখন দেশের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ তখন কেবল গতি পাচ্ছিল, তাই নারীদের নিয়ে প্রতিটি নতুন উদ্যোগ, পদক্ষেপ আর সাফল্যের গল্প আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাত। কর্মজীবনের প্রথম দিকে দেশের সংসদ ও সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সদস্যদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবকাঠামোয় যুক্ত হওয়া নির্বাচিত সেই নারী নেত্রীদের কাছ থেকে আত্মবিশ্বাস আর অদম্য মানসিকতার যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, তা আজও পেশাগত ক্ষেত্রে অনুশীলন করার চেষ্টা করি। 

একথা অনস্বীকার্য যে, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গর্ব করার মতো অনেক অর্জন রয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে এখনও বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের সাফল্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিবেচনায় বাংলাদেশকে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু তথ্য আমাদের মধ্যে উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের স্তম্ভ ছিল গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন আর প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। যেমন বিবিএসের তথ্য অনুসারে, কভিড-১৯ মহামারির পর ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর ৫৫ শতাংশই ছিল মেয়ে শিশু। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর প্রতিবেদন অনুসারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বাল্যবিয়ের হার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। এ উপাত্তগুলো আমাদের একটি করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়–আমাদের দেশের মেয়ে শিশুরা শিক্ষা শেষ করে নিজেদের সক্ষমতা, সামর্থ্য আর স্বপ্নগুলোর বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ হয়তো পাচ্ছে না। 

আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের ঝরেপড়া আর বাল্যবিয়ের হার বাড়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর বিকাশের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও এ ঘটনাগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি। কভিড ১৯-পরবর্তী সময়ে আমাদের শ্রমশক্তি বা লেবার ফোর্সে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেছে। বাল্যবিয়ের বর্তমান এ উচ্চহার বজায় থাকলে আগামী কয়েক দশক হয়তো আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। 

বাল্যবিয়ে আর নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সাম্প্রতিক তথ্যগুলো বিবেচনায় নিলে আমাদের অতীতের অর্জনগুলো কিছুটা মলিন হয়ে যায়। অতীতের সাফল্য আমাদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক আত্মতুষ্টি নিয়ে আসছে কিনা, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। যেমন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট আর কয়েকদিনের মধ্যেই ঘোষিত হবে এবং বাজেট নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। আমাদের জাতীয় বাজেট নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় আমাদের বাজেট জেন্ডার ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বা অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত জুন, ২০২৩ এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমাদের বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ জেন্ডার অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের আসলে বিশ্লেষণ করতে হবে যে, এ বরাদ্দের কতটুকু অংশ নারীর উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। যেমন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, কর্ম-পরিবেশ উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিয়ে। সারা বিশ্ব যখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে (স্টেম) নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগ নিচ্ছে, বিগত অর্থবছরে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বাজেটের মাত্র ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ নারীর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। আমাদের জেন্ডার বাজেটের এ অসংগতিগুলো নিয়ে কিন্তু খুব বেশি আলোচনা হয় না। বাংলাদেশের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আর ভিশন ২০৪১-এ নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বা যে পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই লক্ষ্য অর্জনে এই আনুপাতিক বরাদ্দ যথেষ্ট বা সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা আরও আলোচনার দাবি রাখে।  

নারীর ক্ষমতায়নে অতীতে আমাদের যত অগ্রগতি আর অর্জনই থাকুক না কেন–আগামী দিনগুলোতে ভিশন ২০৪১-এর লক্ষ্য অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে আমাদের নারীর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ অংশগ্রহণ বাড়াতে আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করতে হবে। 

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, কোনো একটি প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণের পর্যায়েই যদি আমরা নারীবান্ধব চিন্তা না করি, পরবর্তী পর্যায়গুলোতে, বিশেষ করে কোনো চলমান প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে আমাদের অনেক বেশি সময় ও সম্পদ ব্যবহার করতে হয়। যদি আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশে নারীর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারি, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। যেমন এক যুগ আগেও আমাদের মাঠ পর্যায়ের বিক্রয় ব্যবস্থাপনা (ফিল্ড সেল্‌স) বা পণ্য বিক্রয়ের কাজে নারীর অংশগ্রহণের হার ছিল খুব কম। এক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হতো যে, হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে নারীর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আসল প্রতিবন্ধকতা ছিল অবকাঠামো। এই চিরাচরিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যখন ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠান মাঠ পর্যায়েও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ শুরু করল, তখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকল। ইউনিলিভার কয়েক দশক ধরে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মৌলিক সুবিধা–যেমন নিরাপত্তা, আবাসন আর যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করে আসছে। তাই ইউনিলিভার যখন মাঠ পর্যায়েও একই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হলো, মাত্র এক দশকের ব্যবধানে শুধু ব্যবস্থাপনা পর্যায় নয়, বরং বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক পর্যন্ত সকল পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হলো। কেবল নারীবান্ধব চিন্তা আর নীতি বাস্তবায়ন করার কারণেই এ পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। নারীর অংশগ্রহণ কম–এ যুক্তিতে যদি কোনো প্রক্রিয়া থেকে নারীর চাহিদাগুলোকে বাদ রেখে নীতি প্রণয়ন করি, আমরা কখনোই সে প্রক্রিয়ায় নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারব না। 

একইভাবে, বাজেট প্রণয়নের সময় নারীর চাহিদার মৌলিক ও বিশেষ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করছি কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীর জন্য নিরাপদ নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত সুযোগ বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করতে পারলে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নারী শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া বা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। নীতি প্রণয়নের সময় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দিতে হবে। 

আশার বিষয় হচ্ছে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট ব্যবহার বা নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির মতো প্রকল্পে সরকার বিনিয়োগ করছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক পর্যায়ের নারীরা এ উদ্যোগগুলোর সুফল পাচ্ছে না। আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হতে চাই, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আর কর্মপরিবেশও উচ্চমানের হতে হবে, যাতে করে আমরা কর্মক্ষেত্রে নারীর আরও বেশি অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারি। আমাদের জন্য আরও একটি আশার বিষয় হচ্ছে, নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়েও রয়েছে নারী নেতৃত্ব। এবারই আমরা প্রথমবারের মতো অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে একজন নারীকে পেয়েছি। সম্প্রতি কিছু আলোচনাতেও জেন্ডার বাজেটের পরিপূর্ণ বাস্তুবায়ন, স্বচ্ছতা ও মনিটরিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো উঠে এসেছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সামনের দিনগুলোতে জেন্ডার বাজেট নিয়ে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর নারীর অংশগ্রহণ থাকবে। তাহলে নারীর জন্য বরাদ্দের আরও প্রত্যক্ষ ব্যবহার আর জেন্ডার বাজেটের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। 

নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তাই অতীতের অর্জনগুলো নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে আমাদের উচিত হবে সেই অর্জন থেকে সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য অনুপ্রেরণা আর শিক্ষা নেওয়া। মনে রাখতে হবে, নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের যাত্রাটা কেবল শুরু হয়েছে, এখনও গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হইনি। 

লেখক: পরিচালক, করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপস অ্যান্ড কমিউনিকেশনস, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড

আরও পড়ুন

×