স ম সা ম য়ি ক
প্রবীণ সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে
প্রতীকী ছবি
শিরীন হক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৬:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক ঘটনাটি সমাজের মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। অন্তত সাত থেকে আট দিন তাঁর নিথর দেহ পড়ে ছিল একাকী একটি ঘরে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বেদনার বিষয় হলো, এই নারীর সন্তানরা সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। কেউ সরকারের যুগ্ম সচিব, কেউ বুয়েটের শিক্ষক, কেউবা কানাডাপ্রবাসী। সফলতার এই ঝকমকে আবরণের নিচে কীভাবে একজন বৃদ্ধ মায়ের চরম একাকিত্ব, অবহেলা আর করুণ মৃত্যুর গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমাদের সমাজ কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন নারীপক্ষ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক
-----------------------------------------------------------
এ ঘটনা বারবার আমার নিজের মায়ের মুখচ্ছবি চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলছিল। যে মা জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, জীবনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন– তাঁকে কীভাবে এভাবে ফেলে রাখা সম্ভব? মতের অমিল হলে আমরা হয়তো কখনও মায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, কিন্তু দিনশেষে আমরা তো মায়ের কাছেই ফিরে যাই। আমার মায়ের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমরা তাঁর পাশেই ছিলাম। আমাদের চোখে ‘সফল’ ও ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত এই সন্তানরা কীভাবে পারলেন তাদের মাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে একা ফেলে রাখতে?
এ ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমসহ সবখানে ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখছি। এর আগে পল্লবীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পরও অনেকে উন্মত্তের মতো দাবি করছেন প্রকাশ্যে ফাঁসি বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। মানুষ বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চায়। মানুষের এই আস্থাহীনতার জায়গাটি আমি বুঝি। কিন্তু আমি এই উন্মাদনার পক্ষে নই। আমাদের আইনের পথেই হাঁটতে হবে। দেশে আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো আমরা এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও পক্ষপাতহীন বিচার ব্যবস্থা পেতাম। শাস্তির বিধান কী হবে, তা নির্ধারণের জন্য আদালত আছে, বিচারক আছেন। এটি সাধারণ মানুষের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয় নয়।
অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে পাস হওয়া ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন’-এর কথা; যেখানে মা-বাবার দেখভাল না করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই আইনের দর্শনের সঙ্গে একমত নই। পিতামাতাকে দেখাশোনা করা সম্পূর্ণ একটি নৈতিকতার বিষয়। একজন মানুষ তাঁর মা-বাবাকে দেখবে কি দেখবে না, সেই নৈতিকতাবোধ তাঁর ভেতর থেকে আসতে হবে। আইন বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানবিক সম্পর্ক বা দায়িত্ববোধ তৈরি করা যায় না; বরং এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। তিন সন্তানের দিকে আঙুল তোলাই যথেষ্ট নয়, আমাদের ভাবতে হবে রাষ্ট্র এখানে কী করেছে? একজন প্রবীণ নাগরিককে কেন সাত দিন মরে পড়ে থাকতে হলো? যাদের সন্তান নেই বা যাদের সন্তানরা প্রবাসী, তাদের দায়িত্ব কে নেবে? এই প্রবীণ মানুষগুলো কর দিয়েছেন, দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। জীবনের শেষ বেলায় তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব তাই রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
উন্নত বিশ্বে, এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে একাকী বসবাসকারী প্রবীণদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। আমাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরও এমন কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। একা থাকা বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন পরিদর্শন করা, তাদের ওষুধ ও চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, এমনকি মাঝেমধ্যে তাদের নিয়ে পার্কে বা খোলা জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আমাদের যৌথ পরিবারপ্রথা এখন ভেঙে গেছে। আমার মায়ের ভাগ্য ভালো ছিল, তিনি শেষ দিনগুলোয় পরিবারের সবাইকে পাশে পেয়েছিলেন, কিন্তু সব মায়ের ভাগ্য তো এমন হয় না। তাই প্রবীণদের সুরক্ষার এই দায়বদ্ধতা এখন সমাজ ও রাষ্ট্রকে কাঁধে তুলে নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের একটি মডেল আমার খুব প্রিয়। সেখানে বৃদ্ধাশ্রমগুলোর সঙ্গে স্থানীয় হাই স্কুলগুলোর একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সমঝোতা থাকে। দশম বা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একেকজন প্রবীণের সঙ্গে যুক্ত হয়। তারা সপ্তাহে কয়েক দিন সেখানে যায়, পত্রিকা পড়ে শোনায়, দাবা খেলে বা তাদের হাত ধরে বাগানে হাঁটে। যতদিন ওই প্রবীণ মানুষটি বেঁচে থাকেন, এই তরুণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একটু ভালোবাসার সান্নিধ্য যে কোনো ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সব সময় একটি কথা বলতেন, ‘বৃদ্ধ বয়সে মানুষ রোগ-শোকের চেয়ে বেশি একাকিত্বের জন্য মারা যায়। একাকিত্বের মতো ভয়ংকর আর কিছু নেই।’
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিজ্ঞতা না বললেই নয়। অনেক বছর আগে আমি ও জাফরুল্লাহ আমাদের দুই বছর বয়সী ছেলে বারীশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েছিলাম আমার এক পরিচিতকে দেখতে। আমরা যখন সেখানকার বিশাল লবিতে ঢুকলাম, দেখলাম অনেক প্রবীণ মানুষ বসে টেলিভিশন দেখছেন। কিন্তু আমাদের ছোট্ট বারীশকে দেখামাত্রই সেখানে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য তৈরি হলো। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো ওই দুই বছরের শিশুটি।
একজন বৃদ্ধ লোক প্রায় কেঁদে ফেলে আমাকে ডাকলেন। বারীশ তখন অচেনা পরিবেশে ভয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে। বৃদ্ধ মানুষটি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি বাচ্চাটিকে একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি?’ আমি সম্মতি জানালেও বারীশ ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল। তখন ওই ভদ্রলোক যা বললেন, তাতে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে পাঁচ ডলার আছে, আমি এই পাঁচ ডলার দেব। আমি শুধু ওর চুলটা একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই।’ দেখলাম, পাশে দাঁড়ানো জাফরুল্লাহর চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। জাফরুল্লাহকে আমি খুব কমই কাঁদতে দেখেছি। সেখান থেকে ফিরেই জাফরুল্লাহ বলেছিল, সে এমন একটি বৃদ্ধাশ্রম করবে, যেখানে মানুষকে মানুষের মতো বাঁচতে দেওয়া হয়। যেখানে প্রবীণদের কেউ একা ফেলে রাখবে না।
সেই স্বপ্ন পূরণে ডা. আলমগীর মিরপুরে জমি দান করেছিলেন। অনেক চড়াই-উতরাই ও জমি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে জটিলতার পর জাফরুল্লাহর সেই স্বপ্নের বৃদ্ধাশ্রমের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আগামী মাসেই আমরা সেটি উদ্বোধন করতে যাচ্ছি।
আমি চিকিৎসক নই, মনোবিজ্ঞানীও নই। কিন্তু জীবন থেকে এটুকু বুঝেছি, প্রবীণদের ভালো রাখার দায়িত্ব কেবল পরিবারের ওপর ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন একটি মানবিক সমাজব্যবস্থা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা বলয়, যেন নুরজাহান বেগমের মতো আর কাউকে একাকিত্বের অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গুনতে না হয়।
- বিষয় :
- প্রবীণ
- শিরীন হক
- বৃদ্ধাশ্রম
