ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

জেন্ডার বাজেট

সংখ্যার আড়ালে প্রান্তিক স্বর

সংখ্যার আড়ালে প্রান্তিক স্বর
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৬:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের নীরস হিসাব বা একগুচ্ছ শুষ্ক সংখ্যার সারণি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিচ্ছবি। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কীভাবে মূল্যায়ন করে, কার প্রতি সে কতটা সংবেদনশীল– তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সেই রাষ্ট্রের বাজেট। বাংলাদেশ যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন সামনে এসে ভিড় করে– এই বিশাল অঙ্কের বাজেটে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী, নারী এবং জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষের প্রকৃত অবস্থান কোথায়? লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
----------------------------------------

গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হলেও এর সুফল নারী, পুরুষ ও অন্যান্য জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টিত হয়নি। ‘জেন্ডার বাজেট’ বা লিঙ্গ-সংবেদনশীল বাজেট কোনো নতুন ধারণা নয়। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটিং শুরু হলেও, বছরের পর বছর ধরে এটি মূলত একটি কাঠামোগত নিয়মরক্ষায় পরিণত হয়েছে। বাজেটে প্রকৃত জেন্ডার সংবেদনশীলতা তাই বর্তমান সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ‘বাজেট পরিপত্র-২’ (২০২৬-২৭) অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়গুলোকে জেন্ডার প্রভাব মূল্যায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ইউএন উইমেন, ইউএনডিপি এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে– কেবল মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানো বা সাধারণ প্রকল্পে নারীর নাম যুক্ত করলেই তাঁকে প্রকৃত জেন্ডার বাজেট বলা যায় না। এ নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মৌলিক ভ্রান্তি রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ইউএন উইমেনের সংজ্ঞামতে, জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেটিং কোনো আলাদা বাজেট নয়। এটি হলো রাষ্ট্রের মূল বাজেটের প্রতিটি স্তরে– প্রণয়ন, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে জেন্ডার লেন্স বা লিঙ্গীয় দৃষ্টিকোণ প্রয়োগ করা।

ধরা যাক, সরকার একটি বড় মহাসড়ক নির্মাণের জন্য বিশাল বাজেট বরাদ্দ করল। জেন্ডার বাজেটের প্রশ্ন হবে– এই রাস্তাটি কি নারীবান্ধব? সেখানে কি নারীদের জন্য পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা এবং শৌচাগারের ব্যবস্থা আছে? এই রাস্তা ব্যবহার করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা কি তাদের পণ্য নিরাপদে বাজারে নিতে পারবেন? এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করে বাজেট কতটা জেন্ডার সংবেদনশীল।

প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের প্রায় ৩০-৩৪ শতাংশ জেন্ডার-সংবেদনশীল খাতে বরাদ্দ করা হয় বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এত বিশাল বরাদ্দের পরও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বা বাল্যবিয়ের মতো ব্যাধিগুলো সমাজ থেকে নির্মূল হচ্ছে না কেন? কারণ, আমরা বাজেটের মাধ্যমে নারীদের চিরাচরিত জগতেই (যেমন সেলাইমেশিন দেওয়া, হাঁস-মুরগি পালনের ক্ষুদ্রঋণ) আটকে রাখছি। এমন খাতে ব্যয় কম হচ্ছে, যা নারীর প্রথাগত অবস্থানকে ভেঙে তাঁকে রূপান্তরমূলক ক্ষমতায়নের দিকে নিয়ে যাবে। যেমন স্টেম বা বিজ্ঞানশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কিংবা উচ্চ প্রযুক্তির কৃষি যন্ত্রপাতি অনুদান।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেমন হওয়া উচিত, তা বুঝতে হলে প্রান্তিক জীবনের দিকে তাকাতে হবে। কারণ, বাজেটের প্রতিটি সংখ্যা কোনো না কোনো নুরুননাহার, তানিয়া বা সুহাসিনীর জীবনের গল্প নির্ধারণ করে।

অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অপরিসীম হলেও, তার বড় অংশই থেকে যায় হিসাবের বাইরে। বিশেষ করে কৃষি খাতে এবং গৃহস্থালি অর্থনীতিতে নারীর শ্রম পুরোপুরি ‘অদৃশ্য’। কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার এক প্রান্তিক কৃষক নুরুননাহার (৪২)। স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর গত পাঁচ বছর ধরে সংসারের দুই বিঘা জমিতে ফসল ফলানোর পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। কিন্তু সরকারি খাতায় তিনি ‘কৃষক’ নন, তিনি কেবলই ‘কৃষকের স্ত্রী’। 
সরকার প্রতিবছর বাজেটে কৃষি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় ‘কৃষি কার্ড’-এর মাধ্যমে। কিন্তু নুরুননাহারের নামে কোনো জমির দলিল না থাকায় তিনি কৃষি কার্ড পাননি। ফলে সরকারি কোনো প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ঋণ বা ভর্তুকির সার তাঁর ভাগ্যে জোটে না। চড়া সুদে ঋণই তাঁর একমাত্র সম্বল। জেন্ডার বাজেটে যদি এই কাঠামোগত বৈষম্যগুলো দূর করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকে, তবে তা কেবলই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তানিয়া আহমেদ (২৮) করোনাকালে নিজের জমানো পুঁজি নিয়ে চামড়াজাত পণ্যের একটি ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য তাঁর ১০ লাখ টাকা ঋণের প্রয়োজন হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বরাদ্দের কথা বলা আছে। কিন্তু তানিয়া যখন ব্যাংকে যান, তখন তাঁকে জানানো হয়– একজন পুরুষ ‘গ্যারান্টার’ ছাড়া ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়। তানিয়ার বাবা নেই এবং স্বামীও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। ফলে তিনি ঋণ পাননি। অথচ প্রতিবছরই নারী উদ্যোক্তাদের ফান্ডের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এবার অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করতে হবে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ যেন বিনা জামানতে এবং সহজ শর্তে বিতরণের বিশেষ মেকানিজম তৈরি করা হয়।

ডে-কেয়ারের আক্ষেপ ও নীরব প্রস্থান
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার অপারেটর সালমা আক্তার (২৬) আট মাস আগে কন্যাসন্তানের মা হন। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কারখানায় কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকায় এবং বাড়িতে সন্তান দেখার কেউ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়। একই চিত্র মধ্যবিত্ত সমাজেও। ব্যাংকার সুমাইয়া সুলতানার একমাত্র সন্তানের বয়স দেড় বছর। বিশ্বস্ত গৃহসহায়িকার অভাবে এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সুমাইয়াকেও গত বছর চাকরি ছাড়তে হয়েছে। অর্থনীতি থেকে এমন দক্ষ নারী কর্মীদের অকাল প্রস্থান ঘটছে কেবল শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের অভাবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেটে ডে-কেয়ারের কথা বলা হলেও তা ঢাকা শহরের কিছু সরকারি অফিসের আশপাশেই সীমাবদ্ধ। শ্রম মন্ত্রণালয় এবং মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে শিল্পাঞ্চল ও শহরভিত্তিক ডে-কেয়ার প্রকল্প না নিলে সালমা-সুমাইয়াদের স্বপ্ন এভাবেই অঙ্কুরে বিনষ্ট হতে থাকবে।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর আখ্যান
বিজয়নগর মোড়ে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত কেয়া হিজড়া বলেন, ‘আমরা যদি পড়াশোনার সুযোগ পাইতাম, কাজের সুযোগ পাইতাম, তাহলে রাস্তায় নামতাম না। আমাদের অধিকার দেন, তারপর দেখবেন আমরাও কারও থেকে কম না!’ আগামী বাজেটে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ও পৃথক বরাদ্দ জরুরি। হিজড়া জনগোষ্ঠীকে হিসাবের বাইরে রেখে বাজেট কোনোভাবেই জেন্ডার সংবেদনশীল হতে পারে না।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারকর্মী ও সমাজকর্মী রানী চৌধুরী বলেন, ‘‘বাংলাদেশের অন্যতম প্রান্তিক হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটের রূপরেখা বরাবরই চরম হতাশার। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মাত্র ১২ হাজার ৬২৯ জন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এনজিওগুলোর মতে, এই সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখ। সরকারি খাতায় জনসংখ্যা কম দেখানোর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজেটে। গত অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। তার ওপর এটি দেওয়া হয় ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে, যেখানে প্রতিবন্ধী বা বিধবা নারীদের সঙ্গে হিজড়াদের মিলিয়ে ফেলা হয়।’’

তিনি আরও বলেন, ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হলে বাজেটে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট খাতে বিশেষ নজর ও বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন– একজন হিজড়া শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুরু হয় তার নিজের পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাধ্যমে। তাই বাজেটে এমন একটি তহবিল থাকা উচিত, যা প্রান্তিক পরিবারগুলোকে সচেতন করতে এবং আর্থিক প্রণোদনা দিতে ব্যবহৃত হবে; যাতে তারা তাদের সন্তানকে রাস্তায় ফেলে না দেয়। পাশাপাশি হিজড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করতে হবে। শিক্ষা না থাকলে তারা বাধ্য হয়েই পথে নামবে। শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, তাদের স্বাবলম্বী করতে সিটি করপোরেশন ও সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন ‘উদ্যোক্তা সহায়তা তহবিল’ গঠন করতে হবে। কেউ যদি ছোট একটি দোকান বা ব্যবসা দিতে চায় তাকে মূলধন দিতে হবে এবং সেই ব্যবসা যেন তারা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে, সে জন্য তদারকি বা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও বাজেটের আওতাভুক্ত থাকতে হবে।’

মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দিয়ে রানী চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা। পরিবার ও সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা যে চরম মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যায়, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে বাসস্থানের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বাজেটে এ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ আবাসন বা আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।’

জলবায়ু পরিবর্তন: একটি জেন্ডার-অসম সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারী ও পুরুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম (৩৫)। আইলা ও আম্ফানের পর এলাকার সব পুকুর যখন লবণাক্ত, তখন পরিবারের খাবার পানির জন্য তাঁকে প্রতিদিন তিন কিলোমিটার হেঁটে পানি আনতে হয়। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ফাতেমা তীব্র জরায়ুর সংক্রমণে ভুগছেন। উপকূলীয় এলাকার অনেক নারী চিংড়ি পোনা ধরার জন্য দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাটান। এর ফলে অনেকের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে। অনেক পরিবার ভেঙে পড়েছে। প্রশ্ন থাকে, পরিবেশ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু অভিযোজনের বিশাল বরাদ্দের কতটুকু ফাতেমাদের মতো নারীদের সুপেয় পানি বা জরায়ুর চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়?

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন নারীরা। বিশেষ করে উপকূল ও চরাঞ্চলে সুপেয় পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবারের সুরক্ষার পুরো দায়ভার নারীর কাঁধেই বর্তায়। তাই জলবায়ু অভিযোজন তহবিলে নারীর সুনির্দিষ্ট চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্মুখ সারির মানুষের জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ এবং অভিযোজনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক বাজেট এখন জরুরি দাবি। পাশাপাশি প্রান্তিক ও নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। বিগত কয়েকটি অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেন্ডার বরাদ্দে সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি থাকলেও জিডিপির অনুপাতে তা ক্রমেই কমছে (২০২১-২২ অর্থবছরের ৫.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬-এ ৪.২ শতাংশ)। জেন্ডার বাজেটকে শুধু নারীদের জন্য আলাদা একটি বরাদ্দ হিসেবে দেখা ভুল। এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোর অংশ। কিন্তু বাস্তবে বরাদ্দের বড় অংশই প্রশাসনিক পর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে জেন্ডার বাজেট ও আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা আশানুরূপভাবে কমছে না। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদের একটি সাহসী ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।’

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও, বাজেট প্রণয়নে তাদের ভূমিকা মূলত আলঙ্কারিক। খাগড়াছড়ির একটি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য সুহাসিনী চাকমা। পাহাড়ি নারীদের পানি সংগ্রহ বা সেলাই প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট চাইলে তাঁকে বলা হয় ‘ফান্ড নেই’। কারণ, রাস্তাঘাটের বড় প্রকল্পগুলো সাধারণ আসনের পুরুষ সদস্যদের কবজায়। 

আগামী বাজেটে এমন বিধান থাকা উচিত, স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন বাজেটের অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের প্রস্তাবিত কল্যাণমুখী প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, দুর্নীতি রোধ করা গেলে জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো গেলে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। এই অর্থ রক্ষা করা গেলে তা সামাজিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য বড় ‘ফিসকাল স্পেস’ তৈরি করবে। 

ফারাহ্ কবির বলেন, ‘‘জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে উন্নয়ন বাজেটে সরাসরি স্বীকৃতি ও সুনির্দিষ্ট বাজেট লাইন প্রয়োজন। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার খাতে পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে গণপরিবহন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চলের ভিন্ন বাস্তবতাকে আলাদা বিবেচনা করে পৃথক বরাদ্দের ওপর জোর দেওয়া জরুরি, যেন নারীরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের শতভাগ সুফল ঘরে তুলতে পারেন। ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তরুণীদের অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করা দরকার। এই শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে সপ্তম শ্রেণি থেকেই পাঠ্যক্রমে সচেতনতামূলক উপকরণ যুক্ত করতে বিদ্যালয়গুলোয় বড় বরাদ্দ দেওয়া উচিত।’’

অধিকার প্রতিষ্ঠান ব্লাস্টের পরিচালক (কমিউনিকেশন ও এডভোকেসি) মাহবুবা আক্তার বলেন, ‘জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সহিংসতার ভুক্তভোগী নারী, শিশু এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার লক্ষ্যে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজপ্রবেশ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান সেবাকেন্দ্রগুলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এতে সহিংসতার ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং পুনর্বাসনের অধিকার আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত হবে।’

একটি বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তা সমাজের সবচেয়ে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির জীবনের অন্ধকার দূর করতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হোক এমন এক দলিল, যা নুরুননাহারের অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেবে, সালমার মাতৃত্বকে সুরক্ষা দেবে এবং ফাতেমাকে জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে টিকে থাকার সাহস জোগাবে। রাষ্ট্রের পালা এখন বাজেটের মাধ্যমে নারী ও জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষদের অবদানের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়ার। তবেই আমরা সত্যিকারের একটি সমতাপূর্ণ, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারব।

আরও পড়ুন

×