কাঠামোগত রূপান্তরের প্রত্যাশা
ফারাহ্ কবির/ কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ
ফারাহ্ কবির
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন নারীরা। বিশেষ করে উপকূল ও চরাঞ্চলে সুপেয় পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবারের সুরক্ষার পুরো দায়ভার নারীর কাঁধেই বর্তায়। তাই জলবায়ু অভিযোজন তহবিলে নারীর সুনির্দিষ্ট চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিগত কয়েকটি অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেন্ডার বরাদ্দে সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি থাকলেও জিডিপির অনুপাতে তা ক্রমেই কমছে (২০২১-২২ অর্থবছরের ৫.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬-এ ৪.২ শতাংশ)। জেন্ডার বাজেটকে শুধু নারীদের জন্য আলাদা একটি বরাদ্দ হিসেবে দেখা ভুল। এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোর অংশ। কিন্তু বাস্তবে বরাদ্দের বড় অংশই প্রশাসনিক পর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে জেন্ডার বাজেট ও আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা আশানুরূপভাবে কমছে না।
এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদের একটি সাহসী ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন–
নির্দিষ্ট বাজেট লাইন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে উন্নয়ন বাজেটে সরাসরি স্বীকৃতি ও সুনির্দিষ্ট বাজেট লাইন প্রয়োজন। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার খাতে পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপদ গণপরিসর ও অবকাঠামো: নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে গণপরিবহন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চলের ভিন্ন বাস্তবতাকে আলাদা বিবেচনা করে পৃথক বরাদ্দের ওপর জোর দেওয়া জরুরি, যেন নারীরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের শতভাগ সুফল ঘরে তুলতে পারেন।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা: ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তরুণীদের অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করা দরকার। এই শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে সপ্তম শ্রেণি থেকেই পাঠ্যক্রমে সচেতনতামূলক উপকরণ যুক্ত করতে বিদ্যালয়গুলোয় বড় বরাদ্দ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রান্তিক ও নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
জলবায়ু ন্যায়বিচার ও দুর্যোগ মোকাবিলা: তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্মুখ সারির মানুষের জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ এবং অভিযোজনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক বাজেট এখন জরুরি দাবি। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের নারী এবং কন্যাশিশুদের দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি ও সুরক্ষায় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও পৃথক অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় দূরদর্শী পদক্ষেপটি আসতে হবে আমাদের রাষ্ট্রীয় হিসাব পদ্ধতিতে। জেন্ডার বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সরকারি বাজেট সিস্টেমে আর্থিক বরাদ্দের পাশাপাশি জেন্ডারভিত্তিক ফলাফল বা আউটপুট সূচক প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হোক। সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সীমিত সম্পদের এ সময়ে সঠিক ও কৌশলগত বিনিয়োগই আমাদের মূল শক্তি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট হোক সেই ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের সুযোগ, যা কেবল প্রতিশ্রুতির খাতা ভারী করবে না, বরং নারী, তরুণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
লেখক: কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ
- বিষয় :
- নারী
- ফারাহ্ কবির
- জেন্ডার বাজেট
