স্বল্প মূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন ও স্কুল প্যাড ব্যাংক
স্কুল প্যাড ব্যাংক ও সাশ্রয়ী মূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন অনেক কিশোরীর জীবনে এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪ | ২২:৩৪ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪ | ১৪:১৪
মাসিক, ঋতু বা ঋতুস্রাব। এটি একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। প্রতিটি নারীরই একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত মাসিক হয়ে থাকে। সাধারণত প্রজননক্ষম নারীর প্রতি মাসে মাসিক হওয়াটাই সুস্থতার লক্ষণ। একজন নারীর জীবদ্দশায় গড়ে ৩০০০ দিন মাসিক হয়ে থাকে। তবে এখনও এই মাসিক বা ঋতুস্রাব নিয়ে আছে নানা কুসংস্কার। এসব কুসংস্কারের কারণেই মেয়েরা মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে আছে। তা ছাড়া বাজারে যেসব স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যায় তার দামও সবার নাগালের মধ্যে নেই।
সাশ্রয়ী মূল্যের, পুনঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রাপ্তি সহজীকরণের জন্য গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় কর্ডএইড ও আরডিআরএস বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে সাসটেইন্ড অপরচুনিটিস ফর নিউট্রিশন গভর্ন্যান্স ‘SONGO’ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।
ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে-২০১৮-এর তথ্য মতে, মাসিককে ঘিরে সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার এখনও অনেক শক্তিশালী। মাত্র ৩৬ শতাংশ কিশোরী এবং ৩০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক নারী, তাদের প্রথম মাসিক হওয়ার আগে মাসিক সম্পর্কে শুনেছেন বা জেনেছেন। এখন প্যাড ব্যবহারের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে, তবে পুরোনো কাপড় ব্যবহারের মাত্রা এখনও অনেক বেশি। যারা পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে ২০ শতাংশেরও কম সঠিকভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে কাপড় সংরক্ষণ করে থাকেন। এরকম পরিস্থিতিতে সঠিক মাসিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই কঠিন হয়ে যায় কিশোরী ও নারীর জন্য। সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অভাবেই অনেক কিশোরী মাসিকের সময় বিদ্যালয়ে যায় না। এভাবে অনেকেই আস্তে আস্তে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে এবং বাল্যবিয়ের শিকার হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় কর্ডএইড ও আরডিআরএস বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত প্রকল্প ‘সঙ্গ’ স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষকদের সহযোগিতায় উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল প্যাড ব্যাংক চালু করেছে। স্কুলের অব্যবহৃত একটি কক্ষে প্যাডগুলো চাকার মতো দেখতে একটি মেশিনে সংরক্ষণ করা হয়, যা মূলত ঋতুচক্রের প্রতীক। এই মেশিন থেকে মেয়েরা এক প্যাকেটে চারটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য প্যাড নিতে পারে। এই প্যাডগুলো বাণিজ্যিকভাবে তৈরিকৃত প্যাডের তুলনায় তিন গুণ সস্তা এবং পরিধান করতেও আরামদায়ক। যেহেতু কাপড়ের তৈরি তাই এগুলো পরিবেশবান্ধবও।
সঙ্গ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৮ জন নারীকে নির্বাচন করে এই প্যাড তৈরি ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে ১২ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত এই নারীরা গার্মেন্টসের ‘ঝুট’ কাপড় থেকে প্যাড তৈরি করে থাকেন। এই নারীরা প্যাড বানিয়ে যেমন আয় করছেন নিজের মতো, তেমনি স্কুলগামী কিশোরীরা খুঁজে পেয়েছে তাদের সাশ্রয়ী স্বাচ্ছন্দ্য। এই প্যাডগুলো সঠিকভাবে ধুয়ে শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। প্যাডের ব্যবহার, মাসিককালীন পুষ্টি এবং মাসিককে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করে সঠিক তথ্য দিতে, সঙ্গ প্রকল্পের রয়েছে নিজস্ব কিছু উদ্যোক্তা। তারা স্থানীয় পুষ্টি বিক্রয় কর্মী বা নিউট্রিশন সেলস এজেন্ট কিংবা পুষ্টি আপা নামে পরিচিত।
স্কুল প্যাড ব্যাংক ও সাশ্রয়ী মূল্যের পরিবেশবান্ধব এই স্যানিটারি ন্যাপকিন গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার অনেক কিশোরীর জীবনে এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এসব স্কুল প্যাড ব্যাংক। এ উদ্যোগের আওতায় মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বিষয়েও প্রয়োজনীয় তথ্য ও জ্ঞান দেওয়া হয়। মাসিক নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সমান অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়। মানসম্পন্ন মাসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট উপকরণ মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার যেমন বাড়ায় ও তেমনি সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
- বিষয় :
- স্যানিটারি প্যাড
- নারী
