নারী অভিবাসী
মরদেহ নিয়ে পরিবারের লড়াই
অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর নারী অভিবাসীদের অনেকেই দেশে ফেরেন ভগ্নহৃদয়ে; এমনকি অনেকে ফেরেন লাশ হয়ে -ছবি :: সংগৃহীত
তানজিলা মোস্তাফিজ
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫১ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:৫৮
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার নারী আরব উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোয় কাজের জন্য পাড়ি জমান। দুঃখজনকভাবে অনেকেই জীবিত ফিরে আসেন না। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৯৫ জন অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরে আসে; যার মধ্যে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। তবে প্রবাসে কিছু মরদেহ দাফন হওয়ায় নারী অভিবাসীর মোট মৃত্যুর সংখ্যা অজানা।
রামরুর গবেষণা অনুসারে, মৃত্যুর ৮৩ শতাংশ ঘটে শ্রমগ্রহণকারী এশীয় দেশগুলোয়। সৌদি আরব, যেখানে ৬৭ শতাংশ নারী অভিবাসী কাজ করতে যান, সেখানে মৃত্যুর হার ৩৮ শতাংশ। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে মৃত্যুর হার অভিবাসীপ্রবাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ৩২ শতাংশ মৃত্যু অপ্রাকৃতিক কারণে ঘটে– যেমন নির্যাতন, দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা।
নরসিংদীর মাধবদীর সাজেদা আক্তার (৫৬) কাজের জন্য গিয়েছিলেন জর্ডানে। রিপোর্টে বলা হয়, তিনি ‘স্ট্রোক’ করে মারা গেছেন। তাঁর ভাই নূর মোহাম্মদ জানান, সাজেদা এক বছর ধরে জর্ডানের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন। হঠাৎ একদিন জানানো হয়, তিনি ভবন থেকে পড়ে মারা গেছেন।
পরিবারের ধারণা, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং হত্যা। মৃত্যুর কারণ জানতে চান তারা। বিদেশের মাটিতে সে উত্তর আজও অধরা।
রামরুর সাম্প্রতিক এক জরিপে ১০০টি মৃত নারী অভিবাসী পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ নারী গৃহকর্মী ছিলেন। অর্ধেকের বেশি পরিবার আগেই প্রিয়জনের দুর্দশা বা নির্যাতনের কথা জানত।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য সেলিম রেজা বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে তাদের দ্রুত কিডনি নষ্ট হওয়ায় মুমূর্ষু রোগী থেকে কিডনি নিয়ে রেখে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কোনো কর্মীর অঙ্গ যেন বিক্রি না হয়, সেটির বিষয়ে দূতাবাসকে সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সচেতনতার অভাবে অনেক কর্মী রাস্তায় ভুলভাবে পারাপার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ক্ষেত্রে সচেতনতার বিকল্প নেই।’
রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের দেশে যে ৩১ শতাংশ অপ্রাকৃতিক মৃত্যু ঘটছে যেমন– দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা এগুলো অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিক মৃত্যুহার মূলত মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অভিবাসীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। অথচ অন্যান্য দেশ থেকে যে মৃতদেহগুলো আসছে, সেখানে দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার হার তুলনামূলক কম।’
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের লক্ষ্মী রানী দাস (৩৫) লেবাননে যান গৃহকর্মীর কাজ করতে। ছয় বছর কাজ করার পর একদিন তাঁর পরিবারের কাছে আসে মর্মান্তিক খবর–তিনি আর বেঁচে নেই। রিপোর্টে লেখা ছিল, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর ছেলে বলরাম তা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমার মা আত্মহত্যা করতে পারে না। আমরা নিশ্চিত, এটা কোনো ষড়যন্ত্র।’ পরিবার চায়, মায়ের মৃত্যুর পেছনের সত্যটা যেন সামনে আসে।
মৃতের পরিবার ক্ষতিপূরণ, পরিবহন, দাফন সহায়তা এবং এককালীন আর্থিক সহায়তার জন্য যোগ্য হলেও দ্রুত অর্থ প্রদান, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ভুল উত্তরাধিকারী শনাক্তকরণের অভিযোগ উঠেছে। এই অবহেলা ও অসম্মানজনক প্রক্রিয়া পরিবারগুলোর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, অনেক নারী অভিবাসী কর্মীর মৃত্যু সন্দেহজনক হলেও তা ‘প্রাকৃতিক কারণ’ হিসেবে সাধারণীকরণ হয়। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যায় এবং পরিবারগুলো সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়। বিরল কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের বিচার হতেও দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে মূলত গন্তব্য দেশে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের ভূমিকাই নির্ধারক হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। খুলনার পাইকগাছার মেয়ে মোসা. আবিরুন বেগম জীবনের উন্নতির আশায় ২০১৮ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান গৃহকর্মী হিসেবে। সেখানে গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ৫১ দিন পর পরিবার প্রথম খবর পায় এবং মরদেহ দেশে ফেরত আসে। মৃত্যুসনদে স্পষ্টভাবে ‘হত্যা’ উল্লেখ করা ছিল। পরে রিয়াদের আদালত ২০২১ সালে গৃহকর্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর দোষীদের কারাদণ্ড দেন। ২০২৩ সালে দূতাবাস ও মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় ১৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা রক্তপণের বিনিময়ে সেই মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো ময়নাতদন্তের প্রচলন। সন্দেহজনক মৃত্যু হলে গন্তব্য দেশে অথবা বাংলাদেশে ময়নাতদন্তের সুযোগ থাকা উচিত। একই সঙ্গে মৃত্যুর সনদপত্রে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্যভাবে উল্লেখ করতে হবে; যাতে তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ‘প্রাকৃতিক কারণ’ জাতীয় অস্পষ্ট শব্দাবলি ব্যবহার না করে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।
এ ছাড়া মৃত অভিবাসীদের পরিবারের জন্য শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনাই নয়, মরদেহ গ্রহণের প্রক্রিয়াও একটি বড় দুঃখের কারণ। রামরুর গবেষণা বলছে, ৮০ শতাংশ পরিবার মরদেহ গ্রহণের জন্য কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণে সমস্যার সম্মুখীন হয়। মরদেহ অন্যান্য কার্গো সামগ্রীর মধ্যে এলোমেলোভাবে রাখা হয়। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা মর্যাদাপূর্ণ অপেক্ষার স্থান নেই। অনেক পরিবারকে মৃত্যুর খবর পেতে এমনকি ছয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেশে ফেরত আসা মরদেহের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে একটি মর্যাদাপূর্ণ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা। মরদেহ রাখার জন্য সম্মানজনক এলাকা এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য অপেক্ষার জায়গা থাকা প্রয়োজন। ময়নাতদন্তের প্রয়োজন হলে হিমঘরের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় একটি সুব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আমাদের, প্রেরণকারী দেশগুলোর একত্র হয়ে বৈশ্বিক ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরা জরুরি। এ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুসনদ প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন রকমের হয়। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বোঝা যায় না। অনেক সময় পরিবার মৃতদেহে ক্ষতের চিহ্ন দেখতে পায়, অথচ মৃত্যুসনদে সেসবের কোনো উল্লেখ থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি অভিন্ন ও মানসম্মত মৃত্যুসনদের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি অল্প বয়সে মৃত্যুর বিষয়টি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।’
নারী অভিবাসীদের জন্য অভিবাসন-পূর্ব প্রশিক্ষণ আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হওয়া দরকার। প্রশিক্ষণে দীর্ঘস্থায়ী রোগ ব্যবস্থাপনা, শারীরিক ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকি এবং গন্তব্য দেশের স্থানীয় শ্রম কল্যাণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করার কৌশল শেখানো উচিত; যাতে অভিবাসী নারী শ্রমিকরা নিজের নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারেন। সেই সঙ্গে ওইসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তদারকি জরুরি; যা বাস্তবায়ন কেবল মৃত নারী অভিবাসীদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনবে না; বরং জীবিত কর্মীদের জন্যও একটি অধিক নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
- বিষয় :
- নারী
- নারী অভিবাসী
