ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ছাদবাগানে স্বাবলম্বী তন্বী

ছাদবাগানে স্বাবলম্বী তন্বী
×

নিজের ছাদবাগানে নাজমুন নাহার তন্বী

 মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২৪ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২১:৫৭

ঘর-সংসার সামলে আজকের নারী ছাদকৃষি, পাখি পালন, বুটিক এমন অনেক কিছুই করছেন; যার মাধ্যমে তারা ঘরে বসে ভালো আয়-রোজগারও করছেন; যা সংসারে সচ্ছলতা ও নিজের প্রয়োজনও মেটাতে পারছেন। এই নারীদের মধ্যে একজন নাজমুন নাহার তন্বী। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে ছাদে গড়ে তুলেছেন বাগান; যেখানে ফল, ফুল, অর্কিডসহ বিভিন্ন রকম ফল গাছ রয়েছে। ছাদবাগান থেকে মাসে তাঁর আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা।

গাছের সঙ্গে তাঁর ভালোবাসার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। গ্রামে বাড়ির উঠানে পুঁইশাক, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি সবজি গাছের কমতি ছিল না মোটেই। একবার তাঁর ভাই একটি পদ্মফুল গাছ উপহার দেন। তন্বীর খুব ভালো লাগে এ গাছটি। পরে ঢাকায় এসে এটি সংগ্রহ করেন। ভাড়া বাসায় থাকাকালে ছোট পরিসরে বারান্দায় বাগান করেন। মূলত ২০১৬ সালে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় তাঁর বাগানজীবনের শুরু। একবার বাসায় খাবার জন্য জাম আর লটকন আনা হয়। কৌতূহলবশত এর বীজ মাটিতে পুঁতেছিলেন তন্বী। সেখান থেকে গাছ বের হয়। তন্বীর সে কী আনন্দ!

ছাদকৃষির অনেক ইতিবাচক দিকের একটি হলো, এটি মন ভালো রাখে। বিষণ্নতা দূর করে। তন্বীর জীবনেও ছাদকৃষি বিষণ্নতা দূর করেছে। স্নাতক নবম সেমিস্টারে পড়ার সময় বিয়ে হয় তাঁর। এরপর ২০২০ সালের দিকে কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান। ওই সময় আবার বিশ্বজুড়ে করোনার ভয়াবহ প্রকোপ। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন আর ক্যারিয়ার ডিপ্রেশন দেখা দেয় তাঁর মধ্যে। দুটোই তন্বীকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তখন তন্বী গাছের কাজে মন দেন। গাছ সংগ্রহ, চারা, কলম সবই করা শুরু করেন। অনলাইনে গাছ বিক্রির পোস্ট দিতে ক্রেতাও খুঁজে পান। টুকটাক বিক্রি হয়। গাছ ভালো হওয়ার কারণে একই ক্রেতা বারবার তাঁর কাছ থেকে নেওয়া শুরু করেন। এ সময় গাছসংক্রান্ত নানা পরামর্শও দেওয়া শুরু করেন তিনি। এভাবেই সবুজের জগতে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে সেই বিষণ্নতা ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। তবে তন্বীর বাগান হলো বাবার বাসায়। তিনি থাকেন শ্বশুরবাড়ি। দুটি বাসা কাছাকাছি হলেও তাঁকে এ বাসা-ও বাসা করতে হয়।

তন্বীর বাগানে বৈচিত্র্যের কমতি নেই। তিনি ফল, ফুল, সবজি–সব ধরনের গাছই রেখেছেন ছাদে। তাঁর বাগানে অর্কিড, সাকুলেন্ট, বিভিন্ন ফল গাছ আছে। তিনি যে শুধু অর্কিড নিয়ে ব্যবসা করেন বিষয়টা এমন নয়। তবে অর্কিড তাঁর বাগানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই শতাধিক ডেনড্রোবিয়াম জাত, ২০০ প্রজাতির ক্যাকটাস, ৩০ ধরনের ক্যাটেলিয়া, মোকারা, ফেলোনপসিস, গ্রামাটোফাইলাম, মিনি ভ্যান্ডা আছে তাঁর সংগ্রহে। হয়া আছে প্রায় ২০ ধরনের। ইনডোর প্লান্টের মধ্যে আছে অ্যাগ্লোনিমা, ক্যালাডিয়াম ইত্যাদি। গাছ, জাতভেদে দামে ভিন্নতা আছে বলে তিনি জানান। ২০০ থেকে চার হাজার টাকা দামের গাছ তাঁর বাগানে পাওয়া যাবে। আড়াই কাঠার বাড়ির ছাদের পুরোটাই তাঁর বাগান। 

ফেসবুকে তন্বীর পেজের নাম ‘স্ট্রিং অব হার্ট’। ‘বনশ্রী বাগানি’ গ্রুপের আয়োজনে প্রতি মাসে ইভেন্ট হয়। গাছ অদলবদল, বিক্রি হয় সেখানে। কোন গাছ প্রয়োজন সেটি জানালে তন্বী এর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। 

বাগান হোক বা অন্য যে কোনো উদ্যোগ। শেখার একটা ব্যাপার আছে। কেউ কারও কাছ থেকে শেখে। অনেকে আবার করতে করতে শেখে। যাকে বলে ঠেকে শেখা। তন্বী অনেকটা করতে করতেই শিখেছেন। তবে গুগল, ইউটিউবের সাহায্য নিয়েছেন। তন্বী জানান, তিনি নিজে নিজে প্রচুর পরীক্ষামূলক কাজ করতেন; তাতে ব্যর্থ হলেও তিনি থেমে যেতেন না। 
অনেকে বাবা কিংবা স্বামী থেকে মূলধন নিয়ে উদ্যোক্তা জীবন শুরু করেন। তন্বীর গল্পটা এমন নয়। তিনি টিউশনি করে যে টাকা আয় করতেন তার কিছুটা দিয়ে নিজের খরচ চালাতেন আর বাকিটা বাগানের জন্য খরচ করতেন। 

নতুন বাগানির প্রতি টিপস দিয়ে তন্বী বলেন, ‘প্রথমত, জানতে হবে আপনার বাসার পরিবেশটা কেমন এবং এখানে কী গাছ ভালো হবে। মানে প্রথম কাজটা হবে গাছ সিলেক্ট করা। দ্বিতীয়ত, আপনাকে অবশ্যই সেলারকে জানাতে হবে, আপনার বাসার পরিবেশটা কেমন বা কতক্ষণ রোদ আসে। পরিবেশ সম্পর্কে আইডিয়া দিতে হবে। গাছ কেনার আগে অবশ্যই যে গাছটা কিনতে চাচ্ছেন, সেটির যত্ন কেমন বা সেটির রোগবালাই কেমন হবে, তা সম্পর্কে একটু গুগল, ইউটিউবে সার্চ করে নেবেন। যদি আপনি নতুন হন তাহলে অবশ্যই আপনার উচিত হবে ম্যাচিউরড গাছ কেনা, চারা গাছ কিনবেন না। কম দামে দুর্বল গাছ কেনার থেকে একটু বেশি দাম দিয়ে হেলদি গাছ কেনাটা অনেক ভালো। কারণ কুরিয়ারে অনেক সময় গাছ এমনিতেও একটু দুর্বল হয়ে যায়।’

নিজের ছাদবাগান আরও সুন্দরভাবে সাজানোর পরিকল্পনা আছে তন্বীর। অন্যদিকে, অদূর ভবিষ্যতে সবজি ও ফলমূলের খোসা সংগ্রহ করে কম্পোস্ট তৈরি করবেন–এসবই তাঁর আগামীদিনের পরিকল্পনা।

আরও পড়ুন

×