ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অগ্রগতির পথরেখা

অগ্রগতির পথরেখা
×

একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি; যেখানে স্থানীয় কমিউনিটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে

সালমা আলী

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২৫ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২২:০৪

বাংলাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে বহু বছর ধরে কাজ চললেও ব্যক্তিগত আইন, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মতো চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরোধ সনদ (সিডও) স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্যক্তিগত আইনের বিষয়ে সংরক্ষণ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা পুরুষের অর্ধেক পান; স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও স্ত্রীর অংশ কম থাকে (যেমন স্বামীর সম্পত্তির ১৬ ভাগের ২ ভাগ)। তবে কিছু প্রগতিশীল বাবা-মা মেয়েরা যেহেতু সম্পত্তি কম পান, তাই অনেক সময় তাদের নামে ‘দানপত্র’ বা ‘হেবা’ করে দেন। আবার হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা তাদের জীবনকালে কোনো সম্পত্তির মালিক হতে পারেন না, শুধু তা ব্যবহার করতে পারেন। এটি ভারতের ১৯৫৫-৫৬ সালের আইনের বিপরীত–যেখানে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধমূলক আইন অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধে ২০০৮ সালে জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) একজন সদস্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে উচ্চ আদালত একটি দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালা দেন। ওই রায়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সেল গঠনের আদেশ দেওয়া হয়। বর্তমানে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং একটি অর্ডিন্যান্স তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; যা পরে সংসদে আইনে পরিণত হতে পারে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে হয়রানি নিয়ন্ত্রণ এবং থানাগুলোতে ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তার অভাব এখনও প্রকট। পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে এই বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা নারী ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তাবলয়
একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি; যেখানে শুধু পুলিশ নয়–স্থানীয় কমিউনিটি, স্কুল, কলেজ ও ক্লাবগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। উদাহরণস্বরূপ ঠাকুরগাঁও জেলায় স্থানীয় কমিউনিটির উদ্যোগে শিশুশ্রম বন্ধ করে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর সফল মডেলের কথা বলা যেতে পারে। এ ধরনের মডেল কাজগুলোকে চিহ্নিত করে অন্যান্য এলাকায়ও প্রয়োগ করা উচিত। ভুক্তভোগী নারীর জন্য কাউন্সেলিং, গোপনীয়তা রক্ষা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য ভিকটিমকেন্দ্রিক সাপোর্ট সার্ভিস প্রয়োজন। ধর্ষণ বা হয়রানির শিকার নারীকে লজ্জা না দিয়ে বরং তাঁকে দুর্ঘটনার শিকার হিসেবে দেখা উচিত। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটির ভূমিকা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা
রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রতিটি কমিটিতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ (আদর্শগতভাবে ৩৩ শতাংশ) নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য নারীর অভাব নেই; শুধু পরিবার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সুযোগ থাকতে হবে। নারীর বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরার জন্য তাদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। গত ১৫-১৬ বছরে একদলীয় শাসনের কারণে জবাবদিহি কমেছে এবং সংস্কারমূলক কাজগুলো ব্যাহত হয়েছে।
সমন্বয়হীনতা, দক্ষ লোকের অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে অনেক সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। আশা করছি, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব এলে এই বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আসবে এবং নারীরা কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবেন। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পুলিশ, আমলা, আদালত, রাজনৈতিক পরিসর ও স্থানীয় কমিউনিটিতে নারী অধিকার এবং সমতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। 

লেখক: মানবাধিকার আইনজীবী
উপদেষ্টা, বিএনডব্লিউএলএ
শ্রুতিলিখন: দ্রোহী তারা

আরও পড়ুন

×