ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিবিধ ব্যবসায় নওশীনের সাফল্য

বিবিধ ব্যবসায় নওশীনের সাফল্য
×

কাজী নওশীন লায়লা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৫ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:১৬

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। দাদার ইচ্ছায় পড়েছেন প্রকৌশল বিজ্ঞান। চার বছরের ডিপ্লোমা শেষে বিএসসিতে ভর্তি হলেও সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখানেই থেমে যাননি কাজী নওশীন লায়লা। বিবাহিত জীবনে ব্যাংকার স্বামী, দুই সন্তান, শাশুড়ি নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার সামলিয়েও গড়ে তুলেছেন নিজের স্বপ্নের ব্যবসা। বর্তমানে মাসে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকার বিক্রি করেন, খরচ বাদে লাভ থাকে লাখ টাকার বেশি। পাবনার মেয়ে, কুষ্টিয়ার পুত্রবধূ নওশীনের ব্যবসায়ী পরিবার থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে।

২০২০ সালের জুন মাস। কভিডের কঠিন সময়ে তখন তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। নবজাতক সন্তান, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, শিশুর কোলিক সমস্যার সঙ্গে মিলে চারপাশ যেন দমবন্ধ করা এক পরিবেশ। স্বামী জরুরি সেবায় কর্মরত থাকায় বাসায় সহযোগিতা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। হঠাৎ করেই বাবা-মায়ের কাছে কুষ্টিয়ায় ফিরে যেতে হয়। ঠিক সেই সময় জুন মাসে সন্তানের ওয়েনিং পিরিয়ড–অর্থাৎ বাড়তি খাবার দেওয়ার সময় শুরু হয়। বাচ্চার জন্য প্রতিদিন রেডি-টু-ইট ও রেডি-টু-কুক খাবার তৈরি করতে করতে মাথায় আসে নতুন এক ব্যবসার ধারণা। প্রথমে কাছের মানুষদের মাধ্যমেই শুরু হয় এ যাত্রা। স্কুলশিক্ষক বান্ধবীর সন্তান, আবার স্বামীর এক কাজিন যিনি চিকিৎসক–তারাও এই খাবার নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এরপর তিনি নিজের ফেসবুক আইডি ও পেজে পণ্যের প্রচার চালান। বিভিন্ন সামাজিক গ্রুপেও শেয়ার করতে থাকেন নিজের কাজের কথা। এভাবেই শুরু হয় তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা।

কভিডকালীন মানুষ যখন ঘরে বন্দি, তখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল স্বাস্থ্যকর ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী খাবারের। ঘি, নানা রকম বাদাম–কাঠবাদাম, আখরোট, কাজুবাদাম, পেস্তা, সঙ্গে মধু, চিয়া সিডস ও সরিষার তেল ছিল ক্রেতার প্রথম পছন্দ। রমজানে ঘরে বসে বাজার করার প্রবণতা বাড়ায় বেসন, খেজুর, আখের গুড়ের মতো পণ্যের চাহিদাও হু-হু করে বাড়তে থাকে। এখন তিনি কাজ করছেন নানান ধরনের পণ্যে–বাদাম, ঘি, মধু, ফ্রোজেন টিফিন, চিয়া সিডস, মসলা, লবণ, ওটস, হানি নাট, খেজুর ও আখের গুড়, রাজশাহীর আম, কুমড়ো বড়ি–সবই রয়েছে তাঁর সংগ্রহে।

অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাঁর উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর ব্যবসায়িক পেইজে ফলোয়ার ৫৩ হাজারের বেশি। ঢাকায় ফেরার পর তিনি অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই ক্রেতা পেয়েছেন। শুধু খুচরা নয়, পাইকারি ও রিসেলারদের কাছেও যাচ্ছে তাঁর আম, খেজুর ও মসলা। সরাসরি আমদানিকারকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে নিজে বাছাই করে বাজারজাত করেন। তাঁর বড় একটি ক্রেতাশ্রেণি গড়ে উঠেছে নিজের বাচ্চা, বাচ্চাদের বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে। শিশুদের খাবার হিসেবে শতভাগ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পণ্যের গুণগত মানে তিনি রাখেন বিশেষ নজর। গবেষণা আর সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করার অভিজ্ঞতাই তাঁকে দিয়েছে আজকের এই সাফল্য। নওশীন বাচ্চাদের রেডি টু কুক খিচুড়ি মিক্সড, আয়রন সুজি, ফ্রুটি ওটস, পোহা মিক্সড, বাদাম সুজি, সেরেলাক–সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী খাবারও বিক্রি করেন। 

শুরুটা ছিল মাত্র দশ হাজার টাকা দিয়ে। পণ্য পোস্ট করার সঙ্গেই সঙ্গেই তাঁর এক পরিচিত গ্রাহক ১০ কেজি ঘি কিনে নেন। তারা শুধু নিজের জন্যই নয়–আত্মীয়স্বজন, ভাইবোন ও প্রতিবেশীদের কাছেও সেই ঘি পৌঁছে দেন। সেই টাকা তুলেই আবার নতুন পণ্য তোলেন নওশীন। এভাবেই মূলধনের ঘূর্ণায়মান যাত্রা শুরু হয়।

আজ তাঁর সাফল্যের গল্প অনেক বড়। চলতি বছরেই তিনি বিক্রি করেছেন ৩ হাজার কেজির বেশি আম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা রকমের মৌসুমি ও নিয়মিত পণ্য–বাদাম, ঘি, মধু, মসলা, খেজুর, আখের গুড় এবং ফ্রোজেন আইটেম। প্রতিটি ঋতুতেই থাকে আলাদা পণ্যের চাপ, আর সারা বছর ধরে থাকে নিয়মিত ক্রেতার চাহিদা। বর্তমানে মাসে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিক্রি হয় তাঁর ব্যবসায়। খরচ বাদেই লাভ থাকে লাখ টাকার বেশি। প্রবাসী ক্রেতাদের জন্য তাঁর কুমড়ো বড়ির ডিপ ফ্রিজ সবসময় ভরা থাকে। সুইজারল্যান্ড ও লন্ডনে আছেন নিয়মিত রিপিট কাস্টমার, যারা শিশুখাদ্যসহ নানা পণ্য নিয়মিত নেন তাঁর কাছ থেকে।

শুরুতে তাঁর বাবা করেছেন প্রবল বিরোধিতা। নাতনির প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা থেকে তিনি বলতেন, ‘ব্যবসা করলে বাচ্চার যত্ন কম হবে।’ আত্মীয়স্বজনের অনেকেই নানা কটু কথা বলতেন। তবুও তিনি থেমে যাননি। এসব সমালোচনা গায়ে না মেখে নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়েছেন নওশীন।

এই পথচলায় পাশে পেয়েছেন ছেলেকে, মাকে আর ছিলেন কয়েকজন কাছের বন্ধু। স্বামী শুরুতে সরাসরি সমর্থন না করলেও কোনো বাধাও দেননি। ব্যবসায় সফলতা প্রমাণের পর ধীরে ধীরে স্বামী হয়ে ওঠেন শক্ত সমর্থক। আজ বাবা, যিনি একসময় বিরোধিতা করতেন, গর্ব করেন তাঁর কৃতিত্বে। শ্বশুরবাড়ির মুরুব্বিরাও তাঁকে আন্তরিকভাবে প্রশংসা করেন। সামাজিক চাপ, পারিবারিক বাধা আর নানা কটু কথার দেয়াল পেরিয়েই নওশীন নিজের স্বপ্নপূরণের দিকে এগোতে পেরেছেন।

আরও পড়ুন

×