ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মায়ের মানসিক অবস্থার প্রভাব সন্তানের ওপর বেশি পড়ে

মায়ের মানসিক অবস্থার প্রভাব সন্তানের ওপর বেশি পড়ে
×

ছবি:: পাবলো/ইউনিসেফ

কামাল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৩ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই হতে পারে। সেটি অনেকাংশে নির্ভর করে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের ওপর। তবে বিশেষ কিছু কারণে নারীর ক্ষেত্রে মানসিক সংকট একটা ভিন্ন মাত্রা তৈরি করতে পারে। এ নিয়ে আমাদের দেশে এখনও তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। তবে অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, কর্মক্ষেত্রে যেসব সংকটের মুখোমুখি হন নারীরা, তার মধ্যে প্রথমেই আছে বৈষম্যের বিষয়টা।

বৈষম্য বলতে এখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বা জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন; যা অর্থনৈতিকভাবেও হতে পারে। কোনো নারী ও পুরুষের মজুরি বা বেতন যদি লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে পার্থক্য করা হয়, সেটি এক ধরনের বৈষম্য। এ বৈষম্য নারীর ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। আবার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় আছে। নারী যেখানে কাজ করেন, সেখানে তাঁর সহকর্মী, ঊর্ধ্বতনরা কীভাবে সহযোগিতা করছেন–তারা নারী হিসেবে সহকর্মীর প্রতি ভিন্ন কোনো আচরণ করেন কিনা, সেখানে হয়তো যৌন হয়রানির বিষয় আসতে পারে। এ ছাড়া নারীর প্রতি যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিও একটা বিষয় হতে পারে– নারীরা সব কাজ পারেন না। অনেক সময় নারীর প্রতি একটা নিচু ধারণা পোষণ করা হয়। সে ধরনের পরিস্থিতিতেও একজন নারী কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং একইভাবে মানসিক চাপের শিকার হতে পারেন।

এরপরই আসে পরিবারের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীকে শুধু কর্মক্ষেত্রে সময় দিতে হচ্ছে তা-ই নয়; তার বাইরে পারিবারিক বিষয়ও তাঁকে দেখতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় তাঁকে সাংসারিক কাজে অনেক বেশি সময় দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁকে সাংসারিক কাজ, সংসার, সন্তান প্রতিপালনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের চাপও সামাল দিতে হয়।
দুদিক থেকে যদি এমন কোনো ইস্যু তৈরি হয় যেখানে তিনি পারিবারিকভাবেও চাপে আছেন, আবার কর্মক্ষেত্রেও যদি বাড়তি চাপ সংযুক্ত হয়, অবশ্যই এটি একটি বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এমনও নয় যে, সব নারীই এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। শুধু যাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে, তাদের বেলাতে এটি প্রযোজ্য হবে। যারা পরিবার ও সহকর্মীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন, সে ক্ষেত্রে তারা ভালোই থাকবেন।

কর্মক্ষেত্রের এসব সংকট থেকে তৈরি হতে পারে মানসিক চাপ। এটি ধীরে ধীরে কাজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

আমাদের দেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় অনেক বেশি আক্রান্ত। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ২১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বিভিন্ন মাত্রায়। এই হার পুরুষের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মানসিক সমস্যায় পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি ভুগছেন। নারীর মধ্যে এমনিতেই দুর্বলতা (ভালনারেবিলিটি) আছে। কর্মপরিবেশ যদি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে মানসিক বিপর্যয়ের মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে যে ধরনের সমস্যা দেখা যায়, তার মধ্যে বিষণ্নতাই সবচেয়ে বেশি। সার্বিকভাবে আমাদের দেশে বিষণ্নতায় ভুগছে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা অন্য যে কোনো মানসিক সমস্যার তুলনায় অনেক বেশি এবং পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি নারী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এর পেছনে পারিবারিক জীবন, সামাজিক পরিবেশ, কর্মক্ষেত্র–সবকিছুরই ভূমিকা থাকতে পারে। 

নারী যদি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন, তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সেই পরিবারের সন্তানদের ওপর। বিশেষ করে সন্তান যদি কম বয়সী হয়, মায়ের মানসিক অবস্থার প্রভাব সন্তানের ওপর বেশি পড়ে। এটি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। অর্থাৎ নারীরা যদি মানসিকভাবে ভালো না থাকেন, তাদের সন্তানরাও এর জন্য ভুক্তভোগী হয়। এ সন্তানদের মধ্যেও পরবর্তী সময়ে কোনো মানসিক বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। 

মানসিক সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, এই বাড়তি চাপ এবং অন্যান্য সামাজিক কারণে নারী তাঁর চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এর মানে তিনি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিজের আর্থিক স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত আসছে এবং যা হীনমন্যতা তৈরি করতে পারে তাঁর মধ্যে। এটিও মানসিকভাবে একটি পীড়ন তৈরি করবে। আমরা প্রায়ই দেখি, নারীরা অনেক সময় সংসারের প্রয়োজনে বা পারিবারিক চাপে বা সামাজিক কারণে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন ভালো চাকরি পাওয়া সত্ত্বেও। এর ফলে একদিকে যেমন তারা নিজের ও পরিবারের জন্য সরাসরি আর্থিকভাবে অবদান রাখতে পারছেন না, তেমনি এ অক্ষমতা একটা মানসিক পীড়নের জন্ম দিতে পারে।

আবার দেখা যায়, নারী মানসিক চাপে থাকলে এর প্রভাবে সম্পর্কজনিত বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে স্বামী বা সঙ্গীর সঙ্গে অথবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

×