ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রেসিডেন্টকে জনসমক্ষে যৌন হেনস্তা

প্রতিবাদে ফুঁসছে মেক্সিকো

প্রতিবাদে ফুঁসছে মেক্সিকো
×

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেক্সিকোর সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউমকে জনসমক্ষে এক মাতাল ব্যক্তি যৌন হেনস্তা করেছে। এ ঘটনা দেশটির নারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক নারী এ ঘটনায় নিজেদের ভয় ও নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছেন।

২০ বছর বয়সী ছাত্রী প্যাট্রিসিয়া রেয়েস বলেন, ‘যদি প্রেসিডেন্ট এই স্তরের নিরাপত্তা ও দেহরক্ষী নিয়েও যৌন হেনস্তার শিকার হন, তার মানে আমাদের সব নারীই যে কোনো মুহূর্তে হেনস্তার মুখে পড়তে পারেন।’

গত ৪ নভেম্বর মেক্সিকো সিটিতে একটি জমায়েতের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এক মাতাল ব্যক্তি পেছন থেকে এসে প্রেসিডেন্ট শেনবাউমকে জাপটে ধরার চেষ্টা করে এবং তাঁর ঘাড়ে চুমু দিতে উদ্যত হয়। প্রেসিডেন্ট দ্রুত লোকটির হাত সরিয়ে দেন এবং তাঁর একজন সহকারী সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করেন।

পরে ওই লোককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরদিন ক্লদিয়া ঘোষণা করেন, তিনি এর বিরুদ্ধে মামলা করবেন। নিজের প্রতিদিনের সংবাদ সম্মেলনে ক্লদিয়া শেনবাউম দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘এটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যা আমি একজন নারী হিসেবে অনুভব করেছি। কিন্তু এটি আমাদের দেশের সব নারীই অনুভব করেন। আমি যদি অভিযোগ দায়ের না করি, তবে মেক্সিকোর সব নারীর কী হবে? যদি তারা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এমন করে, তবে দেশের অন্য নারীদের কী হবে?’ দেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্টকে জনসমক্ষে এভাবে হেনস্তা হতে দেখে অনেক নারীর কাছেই তা ব্যক্তিগত অপমানের মতো মনে হয়েছে। নারীবাদী কর্মী ও শিল্পী মারিয়া আন্তোনিয়েতা দে লা রোসা বলেন, ‘এটা সত্যিই অপমানজনক ছিল। আমি রাগ, ক্ষোভ এবং অসহায়ত্ব অনুভব করেছি।’

এ ঘটনা মেক্সিকোয় নারীদের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার সহিংসতার প্রেক্ষাপটে আরও বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন নারী নিহত হন। এ বছর প্রথম ছয় মাসেই পাঁচ শতাধিক নারী ‘ফেমিসাইড’ বা লিঙ্গভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

দে লা রোসা বলেন, ‘হেনস্তার বিষয়টি হলো সহিংসতার ভিত্তিপ্রস্তর, যা শেষ পর্যন্ত ফেমিসাইডে গিয়ে শেষ হয়। তাই একটি ফেমিসাইডপ্রবণ দেশে বসবাস করার অর্থ হলো, হেনস্তার বিষয়টি সব সময়ই বিদ্যমান।’

এই হেনস্তার ঘটনা রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন স্তরে নিন্দার ঝড় তুলেছে। বিরোধী দল সিটিজেন্স মুভমেন্টের কংগ্রেসওম্যান প্যাট্রিসিয়া মার্কাডো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট রাস্তায়, জনসমক্ষে, কর্মক্ষেত্রে হাজার হাজার নারী যা অনুভব করেন, তাই উপলব্ধি করেছেন। এই আক্রমণ, এই স্পর্শ আমাদের নারী শরীরকে যেভাবে আক্রমণ করে, তা অত্যন্ত গুরুতর।’

বিভিন্ন দলের সিনেটররা বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্লদিয়ার ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান। শেনবাউমের দল মোরেনার সিনেটর আলেজান্দ্রা আরিয়াস বলেন, ‘যদি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আমাদের সর্বোচ্চ কমান্ডার, আমাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এমনটা ঘটে, তবে তা নীরবে প্রতিদিন আমাদের দেশের হাজার হাজার নারীর সঙ্গেও ঘটছে।’

৪০ বছর বয়সী সেবিকা অ্যালিসিয়া গুতিয়ারেজ গণপরিবহনে নারীদের ঝুঁকির বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন। তিনি জানান, প্রায়ই পুরুষরা অতিরিক্ত কাছে চলে আসে এবং একবার এক ব্যক্তি বাসে তাঁর সামনে অশালীন কাজ শুরু করে। তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করি খুব ভিড়ে বাসে না উঠতে বা সব সময় একজন নারীর পাশে বসতে।’ ক্লদিয়ার ঘটনা শুনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হয়ে যদি তিনি এভাবে হেনস্তার শিকার হন, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কি কোনো আশা আছে?’ এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নারী রাজনীতিবিদরা নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মোরেনা দলের আরেক সিনেটর লরা ইৎজেল কাস্টিলো বলেন, ‘মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধটি কেবল তাঁর নিরাপত্তা, সংহতি ও মর্যাদাকেই লঙ্ঘন করেনি, এটিকে যৌন নির্যাতন বলা হয় এবং এটি অবশ্যই সারাদেশে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগামীতে দেশের সমতা কমিশনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করব, যাতে আমাদের আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত কর্মসূচি পর্যালোচনা করে নারীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ, মোকাবিলা এবং শাস্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা যায়।’

হাউস ক্লিনার সোফিয়া ল্যান্ডা বলেন, এ হামলার অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘অনেক নারীই এই কষ্ট ভোগ করেন। ক্লদিয়ার হাতে এখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা রয়েছে।’

আরও পড়ুন

×