ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিজেরাই ঠেকাচ্ছে বাল্যবিয়ে

নিজেরাই ঠেকাচ্ছে বাল্যবিয়ে
×

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া যূথিকা রানীর (ডান থেকে দ্বিতীয়) বিয়ে বন্ধ করেছে কিশোর-কিশোরীরা। তাদের স্বপ্ন একসময় দেশে বন্ধ হবে বাল্যবিয়ে। ছবি: সমকাল

হাসান জাকির, কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ছয় কোটি ৪০ লাখেরও বেশি শিশু রয়েছে; যার মধ্যে কিশোর-কিশোরী তিন কোটি ৮০ লাখেরও বেশি। ১৮ বছরের আগেই দেশের তিন কোটি ৮০ লাখ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায় আর ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয় এক কোটি ৩০ লাখ কিশোরী।

শিশু এবং কিশোর-কিশোরীর সুস্থতা এবং সুস্থতার গ্রাফে উন্নতি হলেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।  পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ বলছে, দেশে বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, রংপুরে অপেক্ষাকৃত বাল্যবিয়ের হার বেশি। বাল্যবিয়ের শিকার মূলত কিশোর-কিশোরীরা। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে হতে পারে তারাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। 

বিষয়টি মাথায় রেখে বাল্যবিয়ে, শিশুর প্রতি সহিংসতাসহ ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা প্রতিরোধে এবং শিশু-কিশোর-কিশোরীর জীবনমান উন্নয়নে ইউনিসেফের সহযোগিতায় ‘স্ট্রেনদেনিং সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়ার চেঞ্জ-এসএসবিসি’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। এ প্রকল্পের আওতায় এ দুই জেলার মোট চারটি উপজেলায় বাল্যবিয়ে ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে বিভিন্ন উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘কিশোর-কিশোরী গ্রুপ’ গঠিত হয়েছে। প্রতিটি ক্লাবের সদস্য ৩০ জন; যেখানে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করছে শিশুরাই! ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্প চলবে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছি ইউনিয়নের নওয়ানীপাড়া গ্রাম। নিতাই চন্দ্রের টিনের বেড়ায় মাটির ঘর। উঠানে মাদুর বিছিয়ে বসেছে একদল কিশোর-কিশোরী। তারা সবাই পাঁচগাছি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কিংবা খোগাদহ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের আলোচ্য বিষয় বাল্যবিয়ে, শিশুর প্রতি সহিংসতা আর বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে একজন ফ্যাসিলিটেটর ধারণা দেন। 

সেখানে কথা হয় সুবর্ণা রানী, রবি চন্দ্র, লিফা খাতুনদের সঙ্গে। সুবর্ণা রানী জানায়, তারা বাল্যবিয়ে থেকে মুক্তি চায়। এ জন্য তারা ‘কিশোর-কিশোরী গ্রুপ’ তৈরি করে নিজেরা এর কুফল সম্পর্কে জানছে এবং তাদের সহপাঠী থেকে শুরু করে আশপাশের অভিভাবক ও শিশু-কিশোরদের এ বিষয়ে সচেতন করছে।

রবি চন্দ্রের ভাষ্য, ‘শিশুর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ও বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে আমরা সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি। পাশাপাশি কেউ বাল্যবিয়ের উদ্যোগ নিলে সেটি বন্ধ করতে অভিভাবকদের বোঝাচ্ছি। এতে কাজ না হলে আমরা ইউনিয়ন পরিষদের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সহযোগিতা নিই। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো আছেই। প্রয়োজনে বাল্যবিয়ে ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকারের হটলাইন নম্বর ১০৯ ও ১০৯৮ ব্যবহার করছি।’

রবির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে লিফা জানায়, তারা গ্রুপের সদস্য যূথিকা রানীর বিয়ে বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। আলোচনা সভায় উপস্থিত যূথিকা রানী ক্লাসের প্রথম সারির মেধাবী ছাত্রী। টানাপোড়েনের সংসারে দিনমজুর বাবা যুগল চন্দ্র গত বছর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই কথিত ভালো ছেলে পেয়ে যূথিকার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। গ্রুপের কিশোর-কিশোরীরা যূথিকার মা-বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হন যত ভালো ছেলেই হোক মেয়েকে ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না। হাস্যোজ্জ্বল কিশোরী যূথিকার স্বপ্ন বড় হয়ে ভালো চাকরি করবে এবং মা-বাবার অভাব ঘোচাবে। 

একই গল্পের চরিত্র যেন পাশের ইউনিয়নের যাত্রাপুর আদর্শ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির সেরা শিক্ষার্থী নূর এ সালমা। দুর্গম চরে বাড়ি হওয়ায় স্থানীয় এক বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করছিল সে। নিজের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কিশোরী সালমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চান ওই বাড়ির অভিভাবক। সেখান থেকে পালিয়ে সালমা এখন তার শিক্ষকের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। সালমা স্বপ্ন দেখে, বাল্যবিয়ে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। প্রকল্পটির আওতায় ‘পিআর এডুকেটর গ্রুপ’-এর সদস্য সালমা। ওই স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিপড়ুয়া ৩০ শিক্ষার্থী এ গ্রুপের সদস্য। সপ্তাহে একদিন তাদের নিয়ে সেশন পরিচালনা করা হয়। গ্রুপের সদস্য অনামিকা আক্তার, আইরিন সুলতানা, রুকাইয়া জান্নাত জানায়– ‘আর যেন একটিও বাল্যবিয়ে সংঘটিত না হয়। এ জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ 

এসএসবিসি প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর থেকে কুড়িগ্রাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাদের কর্ম এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত প্রচেষ্টায় ২৪৪টি বাল্যবিয়ে বন্ধে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে কিশোর-কিশোরী গ্রুপ। 

এ বিষয়ে এসএসবিসির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আজিজুল হক বলেন, ‘আমরা কমিউনিটির শিশু-কিশোর-কিশোরী ও যুব ফোরামের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করছি; যাতে তারাই পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।’ 

কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে। কিশোর-কিশোরী গ্রুপ এবং যুব ফোরামের সদস্যরা আমাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে একযোগে কাজ করতে হবে।’

আরও পড়ুন

×