ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতি তিনজনে একজন নিগ্রহের শিকার!

প্রতি তিনজনে একজন নিগ্রহের শিকার!
×

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে এখন আর কেবল ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি মানবাধিকারের এক গুরুতর লঙ্ঘন ও বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থাগুলোর সদ্য প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন তাঁর জীবদ্দশায় সঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংখ্যার হিসাবে এই ভুক্তভোগী নারী প্রায় ৮৪ কোটি।

পরিসংখ্যানের গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সহিংসতার শিকড় কত গভীরে প্রোথিত। গত ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ নারী যাদের সঙ্গী বা স্বামী আছেন; তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্যাতনের বয়সভিত্তিক বিন্যাস। প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, সহিংসতা অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই মেয়েদের জীবনে কালো ছায়া ফেলতে শুরু করে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ১৬ শতাংশই তাদের ২০তম জন্মদিনের আগেই স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ কিশোরীর শৈশব বা কৈশোরকালেই তাদের নিরাপত্তা ও বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

সঙ্গীর বাইরেও অনিরাপদ নারী
নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল ঘরের চার দেয়ালে বা অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো স্বামী বা সঙ্গীর বাইরের ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত যৌন সহিংসতার জাতীয় ও আঞ্চলিক পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ নারী ও কিশোরী (আনুমানিক ২৬ কোটি ৩০ লাখ) পরিবারের বাইরের লোকদের দ্বারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যদিও অন্তরঙ্গ সঙ্গীর নির্যাতনের তুলনায় এ সংখ্যাটি কম মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়েও ভয়াবহ। ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজ ও পরিবারের ভয়ে, লোকলজ্জা বা ভিকটিম ব্লেমিংয়ের আশঙ্কায় অধিকাংশ নারী এ ধরনের নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। ফলে প্রকৃত সংখ্যাটি নথিবদ্ধ পরিসংখ্যানের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া ক্ষত
এই সহিংসতার প্রভাব কেবল শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনে। অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ, যৌনবাহিত রোগ এবং গভীর বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের মতো সমস্যাগুলো ভুক্তভোগী নারীর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। আশঙ্কার বিষয় হলো, সহিংসতার এই বিষবাষ্প পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু তাদের মায়েদের নির্যাতিত হতে দেখে বড় হয়, তারা নিজেরাও মানসিক ও শারীরিক নানা জটিলতায় ভোগে। এমনকি বড় হয়ে তাদের নিজেদের জীবনেও সহিংসতায় জড়ানো বা ভুক্তভোগী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এভাবেই সহিংসতার চক্র এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হতে থাকে।

উন্নয়নশীল ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ঝুঁকি বেশি
যদিও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই নারী নির্যাতন একটি সাধারণ ঘটনা, তবুও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটভেদে এর তারতম্য রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোয় নারী সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। উদাহরণস্বরূপ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোয় (অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বাদে) গত এক বছরে নারী নির্যাতনের হার ছিল ৩৮ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের (১১ শতাংশ) তিনগুণেরও বেশি। এ ছাড়া বয়স্ক নারী, প্রতিবন্ধী নারী এবং মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে বসবাসকারী নারীরা অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

তহবিল সংকট ও বৈশ্বিক অবহেলা
গত দুই দশকে নারী নির্যাতন কমার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর–বার্ষিক মাত্র ০.২ শতাংশ। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস যথার্থই বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা মানবতার প্রাচীনতম ও সবচেয়ে ব্যাপক অবিচারগুলোর একটি, অথচ এর প্রতিকারে আমাদের উদ্যোগ সবচেয়ে কম। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল জানা থাকা সত্ত্বেও এর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান ক্রমশ কমছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তার মাত্র ০.২ শতাংশ বরাদ্দ ছিল নারী নির্যাতন প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে। ধনী দাতা দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট কাটছাঁট এবং ইউএসএআইডির মতো সংস্থাগুলোর তহবিল সংকোচনের ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা খাতগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা নির্যাতিত নারীর জন্য অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল ছিল।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো হলো–আগের চেয়ে অনেক বেশি দেশ এখন নীতি প্রণয়নের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য, আইনি ও সামাজিক সেবা জোরদার করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর কাছে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ডব্লিউএইচও।

একটি সমাজ নিজেকে তখনই সুস্থ ও ন্যায়পরায়ণ দাবি করতে পারে, যখন তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী ভয়ের বদলে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ পায়। নারীর জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা কেবল তাদের অধিকার নয়, এটি শান্তি ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। 

আরও পড়ুন

×